বছরের পর বছর শ্রম দিয়েও বদলায়নি জীবন, ৩৫০ টাকায় দিন কাটে ঈশ্বরদীর আদিবাসী শ্রমিকদের
পাবনা প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ সুগারক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (বিএসআরআই) বছরের পর বছর কাজ করেও স্থায়ী চাকরি ও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ উঠেছে পাবনার ঈশ্বরদীর স্থানীয় আদিবাসী শ্রমিকদের বড় একটি অংশের। অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, কম মজুরি এবং বিকল্প কাজের সীমিত সুযোগের কারণে দীর্ঘদিন শ্রম দিয়েও দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে পারছেন না তারা।
পাবনা-ঈশ্বরদী মহাসড়কের পাশে ঈশ্বরদীর মুলাডুলিতে প্রায় ৭০০ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ সুগারক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই)। আরামকোলা ও বহরপুর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এ প্রতিষ্ঠানে গবেষণার প্রয়োজনে আখ উৎপাদন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এসব আখের জমিতে কাজ করে আসছেন স্থানীয় আদিবাসী নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা।
ভূমিহীন ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ, শিক্ষা থেমে যায় পঞ্চম শ্রেণিতে
মুলাডুলি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে বাগদি, মুন্ডা, মালপাহাড়ি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ ভূমিহীন। অধিকাংশ পরিবারই অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
মুলাডুলি ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান প্রশাসক ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শিহাব ইসলাম বলেন, উপজেলায় প্রায় ৯০০ আদিবাসী পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ৪০০-এর বেশি পরিবার মুলাডুলি ইউনিয়নে বসবাস করে। তাদের প্রধান পেশা কৃষিকাজ।
তিনি বলেন, আদিবাসী পরিবারের শিশুরা স্থানীয় বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও অধিকাংশের শিক্ষাজীবন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। এরপর তাদের আর পড়াশোনা করতে দেখা যায় না। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে তারা কোনো না কোনো কাজে যুক্ত হয়ে যায়।
শিহাব ইসলাম আরও বলেন, আদিবাসী পরিবারগুলোর প্রায় সবাই ভূমিহীন। হাতে গোনা এক-দুইটি পরিবার এক থেকে দুই শতাংশ জমি কিনে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে।
মাস্টাররোলে কাজ, নেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা
বিএসআরআইয়ের অধিকাংশ শ্রমিক মাস্টাররোলে কাজ করেন। এ ধরনের অনিয়মিত নিয়োগ ব্যবস্থায় কাজের স্থায়িত্ব বা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে কাজ অস্থায়ী ও মৌসুমি হওয়ায় মৌসুম শেষ হলে কাজও শেষ হয়ে যায়। পরবর্তী মৌসুমে আবার কাজ পাওয়া যাবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের সংশোধিত হারে পাবনা জেলার জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দৈনিক অস্থায়ী শ্রমিকের মজুরি ৭০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের জুলাই থেকে এ হার কার্যকর হওয়ার কথা। একই নীতিতে নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মধ্যে মজুরি বৈষম্য না রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে বিএসআরআইয়ের আদিবাসী মাস্টাররোল শ্রমিকদের অভিযোগ, তারা সরকার নির্ধারিত এই হারে মজুরি পান না। একই কাজ করেও নারীরা পুরুষের তুলনায় কম মজুরি ও সুবিধা পান বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আদিবাসী শ্রমিক সনাতন বিশ্বাস বলেন, তিনি ও তার পরিবারের সবাই বিএসআরআইয়ের ফার্মে কাজ করেন। তাদের দৈনিক মজুরি ৩৫০ টাকা। নারীরাও ৩৫০ টাকা মজুরি পান।
শ্রমিক বার্নার্ড বিসওয়াস বলেন, কাজের প্রয়োজন বলেই যা টাকা দেওয়া হয়, সেটাই নিতে হয়। কাজ না থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। আবার আদিবাসী হিসেবে তাদের অন্য কাজের সুযোগও কম।
আরেক শ্রমিক লাকিন্দার হোসোল বলেন, বছরের পর বছর বিএসআরআইয়ে কাজ করেও স্থায়ী হওয়ার কোনো সুযোগ হয়নি। কাজ থাকলে টাকা পান, কাজ না থাকলে অন্যের জমিতে কাজ খুঁজতে হয়।
নারী শ্রমিকদের অভিযোগ, একই কাজেও কম মজুরি
আদিবাসী নারীদের পরিস্থিতি আরও কঠিন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। আদিবাসী পরিচয়ের কারণে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকার পাশাপাশি নারী হওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রেও মজুরি বৈষম্যের মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নারী শ্রমিক জুথি বিসওয়াস বলেন, অনেক দিন ধরে তারা এখানে কাজ করছেন। কিন্তু তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। অনেকে কথা বলেন, প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় না। নারীদের কাজের মূল্যও কম দেওয়া হয়। পুরুষদের মতো একই কাজ করার পরও সংসারের কাজের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাদের প্রত্যাশা, সন্তানরা যেন ভালোভাবে বাঁচতে পারে।
পারিজপুর আদিবাসী সমিতির নেতা সন্তোষ মালহো বলেন, আদিবাসী শ্রমিকদের অবস্থা ভালো নয়। বছরের পর বছর কাজ করেও স্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই। মাস্টাররোল শ্রমিকদের মজুরি শ্রমের তুলনায় কম এবং নারীরা আরও কম পান। সরকার নির্ধারিত মজুরি কত, সেটিও অনেক শ্রমিক জানেন না। মজুরি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও তারা ভয় পান।
কৃষিশ্রমই প্রধান আয়ের উৎস

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিএসআরআইয়ের বাইরে আদিবাসীদের আয়ের প্রধান অবলম্বন কৃষিশ্রম। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে কৃষিকাজ করে দিনভর শ্রম দিলেও তাদের দৈনিক আয় মাত্র ৩৫০ টাকা বলে শ্রমিকরা জানিয়েছেন।
এই সামান্য আয় দিয়েই খাবার, পোশাক, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা এবং পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হয়। ফলে দীর্ঘদিন শ্রম বিক্রি করেও এসব পরিবার দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে পারছে না।
আখের পাতার ঘরে বসবাস, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে দারিদ্র্য
মুলাডুলি ও আশপাশের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলো ঘুরে দেখা যায়, অনেক পরিবার অত্যন্ত দুর্বল ও অনিরাপদ ঘরে বসবাস করছে। অধিকাংশ পরিবারের থাকার ঘর ছোট। আখের শুকনো পাতা, ভাঙা টিন ও বিভিন্ন পরিত্যক্ত উপকরণ দিয়ে কোনোভাবে তৈরি এসব ঘরেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাস করতে হয়।
বর্ষা, শীত কিংবা গরম—কোনো ঋতুতেই এসব ঘর তাদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক আশ্রয় দিতে পারে না।
শ্রমজীবী দুস্থ কল্যাণ সংস্থার স্বেচ্ছাসেবী সুবর্ণা সরকার জানান, ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র থেকে পাওয়া ইক্ষুর উচ্ছিষ্টাংশ দিয়ে ঘর তৈরি করে কোনোভাবে বসবাস করছেন অনেক আদিবাসী পরিবার। এসব ঘর বসবাসের জন্য তেমন উপযোগী নয়। বর্ষাকালে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে এবং শীতকালে ঠান্ডা থেকে রক্ষা পাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে না।
তিনি বলেন, পরিবারগুলোর পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থাও নেই। ফলে নানা ধরনের রোগবালাই লেগেই থাকে। অসুস্থ হলেও আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না।
সুবর্ণা সরকার আরও বলেন, পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে অনেক শিশুকেই অল্প বয়সে জীবিকার তাগিদে কাজে যুক্ত হতে হয়। ফলে তারা ধীরে ধীরে শিক্ষার সুযোগ থেকে দূরে সরে যায়।
সমতলের আদিবাসীদের ভূমি ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ সমতলে বসবাস করলেও তাদের বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন কোনো কাঠামো নেই।
২০১৯ সালের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের গেজেটে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৫০টি জনগোষ্ঠীর নাম রয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি জনগোষ্ঠী সমতলের।
সঞ্জীব দ্রংয়ের মতে, সমতলের আদিবাসীদের ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় নীতিগতভাবে আরও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
সমতলের আদিবাসীদের ভূমি অধিকার নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে দাবি রয়েছে। মধুপুর বন, সুন্দরবন, খাসিয়া পাহাড় ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসীদের ভূমি নিয়ে সমস্যা রয়েছে।
সঞ্জীব দ্রংয়ের ভাষ্য, বর্তমান রাষ্ট্রীয় ভূমি আইন আদিবাসীদের ভূমি অধিকার যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারছে না। সমতলের আদিবাসীদের জন্য আলাদা ভূমি কমিশনের দাবিও দীর্ঘদিনের।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, সংবিধানে নাগরিকদের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে আদিবাসীরা সব ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পান না। পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও সংবিধানে রয়েছে। তবে সেই সুযোগ বাস্তবায়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিএসআরআই মহাপরিচালকের বক্তব্য
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসআরআইয়ের মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. কবির উদ্দিন আহমেদ বলেন, মাস্টাররোল শ্রমিকদের মজুরি, নিয়োগের ধরন, সুযোগ-সুবিধাসহ বিস্তারিত তথ্য জানতে হলে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে হবে।
তিনি বলেন, তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হলে এসব বিষয়ে যথাযথ তথ্য দেওয়া সম্ভব। তবে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন ছাড়া এসব বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে পারবেন না।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য,সাহস,সংযোগ…..
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম