মিরপুরজুড়ে আতঙ্ক, তিন দিন ধরে পোশাকশ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে বিপর্যস্ত জনজীবন
ডেস্ক রিপোর্ট, জেটিভি নিউজ বাংলা
রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুরজুড়ে এখন আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠার পরিবেশ। পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে টানা তিন দিন ধরে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। বিশেষ করে মিরপুর-১০, মিরপুর-২, মিরপুর-১১ ও মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি।
পুলিশ ও আন্দোলনরত শ্রমিকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের কারণে অনেকটা রণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে এসব এলাকা। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের পক্ষ থেকেও পুলিশের ওপর হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে চরম আতঙ্ক। অনেক বাসিন্দা প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হচ্ছেন না। স্কুলগামী শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সরেজমিনে বৃহত্তর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এমন পরিস্থিতির চিত্র পাওয়া গেছে।
সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেলের শব্দে আতঙ্কিত বাসিন্দারা
মিরপুরের পূরবী এলাকার বাসিন্দা আবু হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রবিবারের পর থেকে এই এলাকা মনে হচ্ছে একটা যুদ্ধক্ষেত্র। সকাল সকাল ঘুম না ভাঙতেই সাউন্ড গ্রেনেডের উচ্চ শব্দ, টিয়ারশেলের ঝাঁঝালো গন্ধে আমাদের অবস্থা চরমে পৌঁছেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সকাল থেকে বিকাল শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় এলাকার পরিবেশ থমথমে থাকছে। অনেকে ভয়ে বের হতে পারছে না। বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যেতেও ভয় করছে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ ও পুলিশের অভিযানের কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের নিয়ে বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন অনেক পরিবার।
অলিগলিতে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
শরিফুল ইসলাম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘এই এলাকায় সাধারণ মানুষ ভয়ে বাড়ি থেকে বের হতে চাচ্ছে না। আন্দোলনকারীদের পুলিশ গ্রেফতার করছে। পুলিশ অলিগলিতে এসে নানা কথা জিজ্ঞেস করছে। পুলিশ অনেককে আটকও করছে। এই আতঙ্ক ছড়িয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা গত কয়েকদিন খুব আতঙ্কের মধ্যে আছি।’
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলন ও সংঘর্ষের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণেও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কে কখন বাইরে বের হবেন, কোথায় সংঘর্ষ শুরু হবে—এমন অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে অনেকের।
মিরপুর-২ নম্বরেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত
মিরপুর-২ নম্বর এলাকার বাসিন্দা কাওসারের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘এই আন্দোলনে এই এলাকার কোনও মানুষ শান্তিতে নেই। যেহেতু সংঘর্ষ হচ্ছে সুতরাং মানুষের মধ্যে এক প্রকার আতঙ্ক ঢুকে পড়েছে।’
গৃহিণী শরিফা বেগম বলেন, ‘আমরা একপ্রকার অবরুদ্ধ হয়ে আছি। সকালে বের হলে আতঙ্কের মধ্যে বের হতে হচ্ছে।’
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গতকাল একবার বের হয়ে দ্রুত বাসায় আসতে হয়েছে। আর তো বের হতেই পারিনি। সব এলাকায় আতঙ্ক চলছে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের এসব বক্তব্যে স্পষ্ট, শ্রমিকদের আন্দোলন ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের প্রভাব শুধু আন্দোলনস্থলেই সীমাবদ্ধ নেই; আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে।
বন্ধ চায়ের দোকান ও বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান
সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুরের বিভিন্ন অলিগলির ভেতরে চায়ের দোকানগুলো বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিষেধের কারণে অনেক চায়ের দোকান বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রধান সড়কের পাশে থাকা অনেক বড় বড় দোকানপাটও বন্ধ দেখা গেছে। সংঘর্ষের আশঙ্কা ও এলাকায় বিরাজমান উত্তেজনার কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ছে।
রবিবার থেকে সহিংস রূপ নেয় শ্রমিকদের আন্দোলন
প্রসঙ্গত, পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন শ্রমিকরা। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই দাবির আন্দোলন গত রবিবার থেকে সহিংস রূপ ধারণ করে।
রবিবার আন্দোলনকারীরা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেন। এরপর আন্দোলনরত শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা। একপর্যায়ে পরিস্থিতি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সোমবারও উত্তেজনা, মঙ্গলবার সকাল থেকে ফের সংঘর্ষ
গতকাল সোমবারও শ্রমিকরা রাস্তায় নামার চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে তারা রাস্তায় নামতে পারেননি।
এরপর আজ মঙ্গলবার সকাল থেকেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়। আন্দোলনরত শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। অন্যদিকে শ্রমিকরাও পুলিশের ওপর হামলা চালান এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে মিরপুরের বিভিন্ন সড়ক ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে দুপুরের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
১১ মামলায় আসামি ১০ হাজারের বেশি, গ্রেফতার ছয়জন
এদিকে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় মামলা ও গ্রেফতারের তথ্যও সামনে এসেছে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গতকাল সোমবার বিশৃঙ্খলাকারী হিসেবে প্রায় ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত দুই দিনের সংঘর্ষের ঘটনায় মোট ১১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১০ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র।
তবে মামলাগুলোর বিস্তারিত বিবরণ, আসামিদের পরিচয় এবং গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ওই সূত্রের বক্তব্যে পাওয়া যায়নি।
আতঙ্ক কাটছে না মিরপুরবাসীর
টানা তিন দিনের সংঘর্ষে বৃহত্তর মিরপুরের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও দোকানপাট বন্ধ, কোথাও অলিগলিতে মানুষের চলাচল সীমিত। সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেলের শব্দে আতঙ্কিত বাসিন্দারা প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না।
বিশেষ করে শিশুদের স্কুলে যাতায়াত, কর্মজীবী মানুষের চলাচল এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন স্থানীয়রা।
শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্ট এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে……
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম