সমতলের আদিবাসীরা কেন অদৃশ্য হয়ে পড়ছে?
ভূমি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ন্যায়বিচারে বৈষম্যের দীর্ঘ ছায়া
একসময় ছিল নিজস্ব গ্রাম, জমি, বন ও সামাজিক নেতৃত্ব
একটা সময় সমতলের সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, মাহাতো, হাজং, গারো, খাসি ও রাজবংশীসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি শুধু ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের ছিল নিজস্ব গ্রাম, নিজস্ব ভূমি-ব্যবস্থা, কৃষি, বনজ সম্পদ ব্যবহারের নিজস্ব পদ্ধতি, সামাজিক নেতৃত্ব, আচার-অনুষ্ঠান এবং স্থানীয় অর্থনীতি।
সমতলের সাঁওতাল পল্লির ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ি
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমতলের অনেক অঞ্চলে এসব জনগোষ্ঠীর দৃশ্যমান উপস্থিতি ও সামাজিক ক্ষমতা কমেছে। বাংলা ভাষাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর বিস্তার, নতুন বসতি স্থাপন, কৃষির সম্প্রসারণ, বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো ক্রমে বৃহত্তর বাঙালি সমাজের সঙ্গে মিশে গেছে।
একসময় যে গ্রাম বা অঞ্চলে আদিবাসী সমাজ স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা দৃশ্যমান সামাজিক শক্তি ছিল, পরবর্তী সময়ে সেখানেই তারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাঁওতাল, ওরাঁও, মাহাতো ও মুন্ডা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সমতলের আদিবাসীদের এই অদৃশ্যমানতা মূলত ‘মানুষ কমে যাওয়ার’ গল্প নয়। এটি তাদের দৃশ্যমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কমে যাওয়ার গল্প।
তারা এখনও আছেন—সাঁওতাল পাড়া, মুন্ডা বসতি, ওরাঁও গ্রাম এবং গারো অধ্যুষিত এলাকায়। আছে তাদের ভাষা, উৎসব, গান, ধর্মীয় আচার ও স্মৃতি।
কিন্তু ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, ইতিহাসের বয়ান এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জায়গায় তাদের অবস্থান সংকুচিত হয়েছে।
ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘আদিবাসীরা কেন পিছিয়ে?’—এখানে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। বরং দেখতে হবে, কোন সামাজিক, ভূমি ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একসময় দৃশ্যমান একটি জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে প্রান্তিক ও অদৃশ্য হয়ে পড়েছে।
বৈষম্য আছে, কিন্তু অনেকটাই অদৃশ্য
বাংলাদেশে বৈষম্য নিয়ে অনেক কথা হলেও সমতলের আদিবাসীদের বৈষম্য নিয়ে তুলনামূলকভাবে আলোচনা কম।
কারণ এই বৈষম্যের অনেকটাই সরাসরি চোখে পড়ে না। এটি অনেক সময় মানুষের প্রতিদিনের অভ্যাস, প্রশাসনিক কাঠামো, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সঙ্গে মিশে থাকে।
রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহের ১৫টি আদিবাসী পাড়ায় কথা বলে পাঁচ ধরনের বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে।
দিনাজপুরের ভূমিহীন সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন।
এসবের মধ্যে রয়েছে—
১. ভূমি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য
২. শিক্ষায় বৈষম্য
৩. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য
৪. প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য
৫. ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য
এই পাঁচটি ক্ষেত্র একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। ভূমি হারালে অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়। অর্থনৈতিক দুর্বলতা শিক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করে। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ কমলে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিনিধিত্বও কমে। আর দীর্ঘদিনের এই প্রক্রিয়ায় ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হয়ে পড়ে।
ভূমি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য
‘তোমার জমি, কিন্তু দলিল আমার’
সমতলের আদিবাসীদের জন্য সবচেয়ে পুরোনো ও গভীর সমস্যাগুলোর একটি হলো ভূমির অধিকার।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে জমি তারা চাষ করেছেন, তার অনেকেরই বৈধ দলিল নেই। ব্রিটিশ আমলের সিএস রেকর্ডেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের নাম ওঠেনি।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সে সময় জরিপকারীরা অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা বুঝতেন না। অন্যদিকে আদিবাসী পরিবারগুলোর অনেকেই জরিপের প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত ছিলেন না।
এই সুযোগে ৩০ বছর ধরে কোনো সাঁওতাল পরিবার যে জমি চাষ করে আসছে, একসময় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি দলিল দেখিয়ে বলতে পারেন—‘এটা আমার কেনা জমি।’
দিনাজপুরের ভূমিহীন সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন।
আদিবাসী পরিবারটির কাছে তখন থাকতে পারে শুধু দীর্ঘদিনের ভোগদখলের প্রমাণ ও গ্রামের মানুষের সাক্ষ্য। কিন্তু আদালতে সাক্ষ্যের তুলনায় লিখিত দলিলের গুরুত্ব বেশি।
ফলে অনেক পরিবার একসময় নিজেদের জমি হারিয়ে বর্গাচাষি হয়, পরে দিনমজুরে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ এবং বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের পর সমতলে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী জমির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কমেছে।
সাঁওতালরা আগে যে শালবনে খাস জমিতে চাষ করতেন, সেই বন পরবর্তী সময়ে বিভিন্নভাবে লিজ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাদের অনেক জমির লিখিত দলিল নেই, কারণ ঐতিহাসিকভাবে এসব ভূমি ব্যবস্থাপনার একটি অংশ ছিল মৌখিক ও সামাজিক মালিকানাভিত্তিক।
জমি হারিয়ে অনেকে কৃষক থেকে দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন।
নওগাঁর পত্নীতলা কিংবা দিনাজপুরের বিরলে একসময়ের কৃষক সাঁওতাল পরিবারের সদস্যদের ইটভাটায় কাজ করার চিত্রও পাওয়া যায়।
কারণ অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে শুধু পরিবার নয়, সেই সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ে একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোও।
মজুরিতেও বৈষম্যের অভিযোগ
নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই কাজের জন্য একজন বাঙালি শ্রমিক ৫০০ টাকা পেলেও একজন আদিবাসী নারী শ্রমিক ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পান—এমন অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এর পেছনে কখনও কখনও বলা হয়—‘তোমরা তো এমনিতেই কাজ পাও না।’
অর্থাৎ কাজের সুযোগ কম থাকার বিষয়টিকেই কম মজুরি দেওয়ার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ।
এভাবে ভূমি হারানো, কৃষি থেকে সরে যাওয়া, অনিয়মিত শ্রমবাজার এবং মজুরি বৈষম্য—সব মিলিয়ে অনেক আদিবাসী পরিবার দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
‘ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সমতলের আদিবাসীরা’
নাটোরের বাগাতিপাড়ার লগেন সরেন বলেন, আগের আইন বা প্রথা অনুযায়ী সমতলের আদিবাসীদের জন্য যে ভূমি ব্যবস্থাপনা ছিল, তার যথাযথ মূল্যায়ন কোনো সরকারই করেনি।
তিনি বলেন, সমতলের আদিবাসীদের জমির মালিকানা প্রচলিত ভূমি রেজিস্ট্রেশন নীতিমালার আওতায় নির্ধারণ করা হয়। দলিল, পর্চা ও নামজারি—সবই তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
তার ভাষায়, এমনিতেই তারা সংখ্যালঘু। এর ওপর ভূমির অধিকার রক্ষায় নানা জটিলতার কারণে সমতলের আদিবাসীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
নওগাঁর সাঁওতাল পল্লিতে ঘরের কাজে ব্যস্ত এক নারী।
লগেন সরেনের মতে, বিষয়টি শুধু আদিবাসী নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভূমির অধিকারের ক্ষেত্রে সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক বঞ্চনার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
‘ভূমি অফিসকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে’
গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল বলতে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামকে বোঝা ভুল।
তার মতে, দুই-একটি জেলা বাদ দিলে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।
বৃহত্তর রংপুর, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব অঞ্চলে সরকারি ভূমি অফিসগুলোর ভূমি সুরক্ষা ব্যবস্থায় আরও সংবেদনশীলতা প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ভূমির রেকর্ড ঠিক থাকে না। আবার অনেক আদিবাসী পরিবার তাদের দলিলপত্রও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারে না।
এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে জাল দলিল তৈরি, জমি দখলসহ নানা ঘটনা ঘটে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পাভেল পার্থ বলেন, বিশাল আকারের বেদখলের অনেক ঘটনার পেছনে ভূমির রেকর্ড, দলিল ও প্রথাগত মালিকানা নিয়ে এই জটিলতা কাজ করে।
তার মতে, ভূমি অফিসকে আরও সতর্ক এবং আদিবাসীদের ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আরও সংবেদনশীল হতে হবে।
আইন আছে, বাস্তবায়ন কতটা?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৭ ধারায় নির্দিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি হস্তান্তরের ওপর বিশেষ বিধিনিষেধ রয়েছে। সরকারি আইনভান্ডারে এই ধারায় সাঁওতাল, গারো, হাজং, মুন্ডা, ওরাঁওসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নামও উল্লেখ আছে।
পাভেল পার্থের বক্তব্য অনুযায়ী, আদিবাসীর জমি বিক্রি, বণ্টন বা বিনিময়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধান এবং জেলা প্রশাসকের লিখিত অনুমতির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই অনুমতি নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ কাগজে আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার যথাযথ প্রয়োগ না হলে ভূমি হারানোর ঝুঁকি থেকেই যায়।
ব্যক্তিগত জমি নয়, অনেকের ভূমি সামাজিক সম্পদ
সমতলের আদিবাসীদের ভূমি ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সব জমিকে শুধু ব্যক্তিগত মালিকানার কাঠামোয় দেখা যায় না।
গবেষক পাভেল পার্থের মতে, রাষ্ট্রের প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থাপনা মূলত ব্যক্তিগত মালিকানাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হলেও অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রথাগত সামাজিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
গারো বা মান্দি সম্প্রদায়ের ‘আখিং’ এর একটি উদাহরণ।
আখিং বলতে একটি মাহারি বা বংশের জমিকে বোঝানো হয়। কোনো নির্দিষ্ট মাহারির জমি সেই বংশের সামষ্টিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আবার সাঁওতাল সমাজে রয়েছে ‘মানঝি পরিষদ’। গ্রামের প্রধান হলেন মানঝি। ঐতিহ্যগতভাবে এই পরিষদ সামাজিক সিদ্ধান্ত ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছু প্রথাগত কাঠামোর আইনগত স্বীকৃতি রয়েছে। সেখানে সার্কেল চিফ এবং পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের মতো কাঠামোর মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় পরিচালিত হয়।
কিন্তু সমতলের আদিবাসীদের প্রথাগত সামাজিক ভূমি ব্যবস্থাপনার এমন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই।
ফলে প্রচলিত ভূমি অফিসের কাঠামোর মাধ্যমে সামাজিক মালিকানা ও প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনার সব দিক বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
পৃথক ভূমি কমিশনের দাবি
গবেষক পাভেল পার্থ সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তার মতে, এই কমিশন সমতলের আদিবাসীদের ভূমি ব্যবস্থাপনার জটিলতা বুঝে কাজ করতে পারে।
ভূমি কমিশন গঠন সম্ভব না হলেও সরকারি ভূমি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
তার মতে, ভূমি কর্মকর্তাদের আদিবাসীদের প্রথাগত আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে হবে এবং রাষ্ট্রকে এসব প্রথাগত ব্যবস্থার আইনগত স্বীকৃতি দিতে হবে।
শিক্ষায় বৈষম্য
স্কুলে ঢুকলেও ভাষার দেয়াল
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক।
কিন্তু সমতলের অনেক আদিবাসী শিশুর জন্য স্কুলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সবসময় স্বাভাবিক নয়।
শিক্ষার পথে আদিবাসী শিশুরা।
সম্প্রতি রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কয়েকটি শিশুকে ভর্তি না করার অভিযোগ ওঠে।
অভিভাবকদের অভিযোগ ছিল, ভর্তি না নেওয়ার জন্য বিভিন্ন অজুহাত দেখানো হয়। তাদের ধারণা, আদিবাসী হওয়ার কারণেই সন্তানদের ভর্তি নিতে গড়িমসি করা হয়েছিল।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়।
তবে স্কুলে ঢোকার পরও আরেকটি বড় প্রশ্ন থেকে যায়—ভাষার প্রশ্ন।
সরকার পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় বই প্রকাশ করেছে। কিন্তু সমতলের সাঁওতালি, কুড়ুখ, মুন্ডারি ও কোচ ভাষায় পর্যাপ্ত মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার বই নেই বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন।
ফলে একজন সাঁওতাল শিশু স্কুলে গিয়ে দেখতে পারে—তার মায়ের ভাষার কোনো অক্ষর নেই, তার দেবতার নাম নেই, এমনকি তার গ্রামের নামের বানানও ভুল।
নাম বদলে যাওয়ার অভিযোগ
স্কুলে ভর্তির সময় অনেক শিক্ষক আদিবাসী শিশুদের নামও পরিবর্তন করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘বাস্কে মুর্মু’ হয়ে যায় ‘বাবুল হোসেন’ কিংবা শুধু ‘বাস্কে’।
কারণ হিসেবে কখনও বলা হয়, কম্পিউটারে আদিবাসী নাম লিখতে সমস্যা হয়।
কিন্তু একটি শিশুর জন্য নিজের নাম শুধু একটি শব্দ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে তার পরিবার, বংশ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়।
ফলে নাম পরিবর্তনের মতো বিষয় একটি শিশুর মনে ছোটবেলা থেকেই নিজের পরিচয় নিয়ে সংকট তৈরি করতে পারে।
ভাষা হারানোর শুরু কোথায়?
সমতলের আদিবাসী ভাষাগুলো বর্তমানে বড় ধরনের সংকটের মুখে।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ৪১টির বেশি আদিবাসী ভাষার মধ্যে অন্তত ১৪টি মহাবিপন্ন অবস্থায় রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১০ সালের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি রয়েছে।
সরকার ২০১৭ সাল থেকে পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের বই দিয়েছে—চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও চাক ভাষায়।
সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনা
কিন্তু সমতলের ভাষাগুলোর কোনোটি এই তালিকায় নেই।
ফলে সমতলের কোনো শিশু নিজের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানেও সরকার মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং আদিবাসী ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষামন্ত্রী সংসদে বলেছেন, এ বিষয়ে উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
‘বাংলা শেখ, না হলে চাকরি পাবি না’
একজন ওরাঁও শিশু যখন স্কুলে যায়, প্রথম দিন থেকেই তাকে এমন একটি পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয় যেখানে তার মাতৃভাষা পাঠ্যক্রমে নেই।
তার নাম, গ্রামের নাম, দেবতার নাম কিংবা নিজস্ব সংস্কৃতির অনেক কিছুই বইয়ে থাকে না।
তখন পরিবার অনেক সময় সন্তানকে বলে—‘বাংলা শেখ, না হলে চাকরি পাবি না।’
ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য অংশে
ভাষা হারানোর শুরুটা অনেক সময় এখান থেকেই।
সাদরি বা সাঁওতালি ভাষা এখনও টিকে আছে। কিন্তু লিখিত চর্চার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক শিশু বাড়িতে ভাষাটি বললেও লিখতে পারে না।
কুড়ুখ বা ওরাঁও ভাষা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই ভাষায় সাবলীল বক্তার সংখ্যা ১০ হাজারেরও কম বলে একটি ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।
মুন্ডারি, কোদা ও মাহাতো কুর্মালি ভাষাতেও অনেক ক্ষেত্রে বয়স্করাই বেশি কথা বলেন। নতুন প্রজন্ম ভাষা বুঝলেও বাংলায় উত্তর দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে গাইবান্ধার ওঁরাও, সাঁওতাল ও পাহান জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নিজস্ব ভাষার বইয়ের ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে।
‘শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা দায়ী নয়’
নাটোরের সিংড়া উপজেলার আদিবাসী শিক্ষার্থী লাবনী এক্কা বলেন, আদিবাসী শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে থাকার জন্য শুধু আর্থিক সমস্যাকে দায়ী করা ঠিক হবে না।
তার মতে, আর্থিক সমস্যা কম-বেশি সবারই আছে। কিন্তু পারিবারিক সচেতনতা ও চেষ্টার অভাবও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
লাবনী এক্কা বলেন, অনেক বাবা-মা নিজেরা শিক্ষিত না হওয়ায় সন্তানকে ছোটবেলা থেকে পড়ালেখার প্রতি সঠিকভাবে উৎসাহ দিতে পারেন না।
বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাধা আরও বেশি।
তার এলাকার কলেজগুলো অনেক সময় বাড়ি থেকে ৭ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে। একজন আদিবাসী মেয়ে একা কলেজে যাতায়াত করলে পাড়া-প্রতিবেশীর নানা ধরনের নেতিবাচক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।
এই সামাজিক চাপের কারণে অনেক মেয়েই উচ্চশিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে বলে তিনি জানান।
তবে পরিস্থিতির পরিবর্তনও হচ্ছে বলে জানান লাবনী।
তার মতে, এখন অনেক বাবা-মা সচেতন হচ্ছেন। তারা বুঝতে পারছেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা যাবে না।
আগে আশঙ্কা ছিল শিক্ষা গ্রহণ করলে নিজস্ব ভাষা হারিয়ে যাবে। এখন অনেকে বুঝতে পারছেন, শিক্ষিত হলেই বরং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখা এবং লিপিবদ্ধ করা সম্ভব।
তবে নতুন একটি সংকটও তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।
মেয়েরা এগিয়ে গেলেও অনেক ছেলে পিছিয়ে যাচ্ছে। অল্প বয়সে বন্ধুদের প্রভাবে নেশায় জড়িয়ে পড়া এবং দ্রুত টাকা উপার্জনের আকাঙ্ক্ষায় পড়ালেখা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্ন
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’-এর অনন্য স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় সংবিধানে ২৩(ক) ধারা যুক্ত করা হয়।
তার মতে, সেখানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি।
তিনি বলেন, আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনধারা এবং ভূমির ওপর নিজস্ব অধিকার ও মালিকানার সংস্কৃতি রয়েছে।
সঞ্জীব দ্রংয়ের মতে, অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির ওপর যৌথ বা সামষ্টিক মালিকানার ধারণা রয়েছে। কিন্তু এই ধরনের ‘কালেক্টিভ রাইটস’ সংবিধানে স্পষ্টভাবে স্বীকৃত নয়।
তিনি বলেন, আদিবাসীদের আত্মপরিচয় ও অধিকারকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে সেই স্বীকৃতিকে ভিত্তি করে আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হবে।
এতে জাতীয় আদিবাসী নীতি প্রণয়ন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারেও সঞ্জীব দ্রং বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সমতলের আদিবাসীদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন আলাদা কাঠামো নেই; ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোতে এই প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য
বৈষম্য কখনও দৃশ্যমান, কখনও অভ্যাসের মতো
সমতলের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য।
এটি ঘটে হাটে-বাজারে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে, সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে এবং ধর্মীয় পরিচয়ের স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও।
অনেক এলাকায় আদিবাসীদের দোকানে ঢুকতে দেওয়া হয় না, কিংবা তাদের ছোঁয়া লাগলে পণ্য অপবিত্র হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
কিছু এলাকায় চায়ের দোকানে তাদের জন্য আলাদা কাপ রাখার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়ভাবে কোথাও কোথাও এগুলোকে ‘আদিবাসী কাপ’ বলা হয়।
এসব আচরণ শুধু সামাজিক অপমান নয়; এর মধ্য দিয়ে একটি জনগোষ্ঠীকে অন্যদের থেকে আলাদা ও নিচু হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি হতে পারে।
কাগজে নিজের ধর্মও নেই?
সমতলের অধিকাংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাসের ধরন বৈচিত্র্যময়।
সারনা, সাংসারেক বা প্রকৃতি-ভিত্তিক বিভিন্ন ধর্মীয় ও আচারগত বিশ্বাসের চর্চা রয়েছে।
কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন কিংবা চাকরির ফরমে অনেক সময় ধর্মের ঘরে ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—এই পরিচিত অপশনগুলো থাকে।
নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় লেখার সুযোগ না থাকায় কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অন্য একটি পরিচয় বেছে নিতে পারেন।
ফলে কাগজে-কলমে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যায়।
‘রাষ্ট্র পরিচয় না দিলে পরিচয় সংকট তৈরি হয়’
আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাংবিধানিক স্বীকৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অ্যাডভোকেট প্রমিলা টুডো।
তার মতে, রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না থাকায় প্রতিনিয়ত পরিচয় সংকট ও নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
তিনি বলেন, সংবিধান বা রাষ্ট্র যদি পরিচয় না দেয়, তাহলে সব ক্ষেত্রেই নিজের পরিচয় দিতে দ্বিধা তৈরি হয়।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রমিলা টুডো বলেন, একজন আইনজীবী হওয়ার পরও তিনি যখন নিজের নামের আগে ‘অ্যাডভোকেট প্রমিলা’ বলেন, তখন কোনো কোনো ক্লায়েন্ট তার নাম নিয়েই প্রশ্ন তোলেন।
তার মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসীদের পরিচয় ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানানো হলে এ ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো না।
তিনি বলেন, সংবিধানে ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ বলা হলেও ‘আদিবাসী’ শব্দটি নেই। ফলে আদিবাসীদের আলাদা সংস্কৃতি, ভাষা ও সামাজিক কাঠামোর বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না।
প্রমিলা টুডোর মতে, আদিবাসী স্বীকৃতি মানে রাষ্ট্রের কোনো অংশ দখল করা নয়। বরং নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় নিয়ে দেশের নাগরিক হিসেবে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা।
প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য
‘কোটা আছে, কিন্তু সুবিধা নেই’
সরকারি চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ কোটা থাকার কথা বলা হলেও সমতলের আদিবাসীরা এর সুবিধা পর্যাপ্তভাবে পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।
কোটা ব্যবহারের জন্য জেলা প্রশাসকের সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয়।
কিন্তু সেই সার্টিফিকেট পেতে একজন ব্যক্তিকে প্রমাণ করতে হয় যে তিনি সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য।
জাতীয় পরিচয়পত্রে ধর্ম ‘হিন্দু’ লেখা থাকলে সেই পরিচয় প্রমাণের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এ ছাড়া কোটার তালিকায় সমতলের সব জাতিগোষ্ঠীর নাম না থাকার অভিযোগও রয়েছে।
ফলে কাগজে কোটা থাকলেও বাস্তবে চাকরির ক্ষেত্রে অনেকেই এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন বলে অভিযোগ।
ন্যায়বিচারে বৈষম্য
‘তোমাদের জন্য আইন আলাদা না’
সমতলের আদিবাসীদের আরেকটি বড় সংকট ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো আদিবাসী নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে থানায় গেলে কখনও কখনও তাকে সামাজিক কটূক্তি বা পূর্বধারণার মুখোমুখি হতে হয়।
এ ধরনের মন্তব্য অভিযোগ গ্রহণ, এজাহার এবং তদন্তের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
আরেকটি বড় সমস্যা ভাষা।
আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ায় আদিবাসী ভাষাভাষী মানুষের জন্য পর্যাপ্ত দোভাষী না থাকার অভিযোগ রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেও উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ ও দিনাজপুরের সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাঁও ও মাহাতো জনগোষ্ঠীর মধ্যে থানায় অভিযোগ, আইনি সহায়তা কিংবা মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সীমিত ধারণার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সংবিধান কী বলছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
২৮(১) অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে বৈষম্য না করার কথা বলা হয়েছে।
২৮(৪) অনুচ্ছেদে নারী, শিশু বা নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগের কথা বলা হয়েছে এবং ২৯(৩)(ক)-তে অনগ্রসর নাগরিকদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষ বিধান করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ সংবিধানে সমতার পাশাপাশি অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগও রয়েছে।
‘অধিকার আছে, কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ কতটা?’
আদিবাসীদের নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের মতে অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি থাকলেও ক্ষমতার কাঠামোয় তাদের কণ্ঠ অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল।
ভূমি হারানোর মধ্য দিয়ে কৃষিভিত্তিক জীবন দুর্বল হয়েছে। অর্থনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে দারিদ্র্য বেড়েছে। জীবিকার সন্ধানে অনেকে অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
এর ফলে দুর্বল হয়েছে নিজস্ব পাড়া, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় নেতৃত্ব।
কমেছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যবহার।
একসময় বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় অনেক জায়গায় তাদের আলাদা সামাজিক দৃশ্যমানতাও কমেছে।
আর এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াই তৈরি করেছে অস্তিত্ব ও পরিচয়ের সংকট।
‘হাজার হাজার একর জমি চলে গেছে অন্যদের দখলে’
বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেত্রী রেবেকা সরেন বলেন, আদিবাসীদের ভূমির বড় একটি অংশ আজ তাদের হাতছাড়া।
তার অভিযোগ, নানা কৌশলে তাদের কাছ থেকে জমি নেওয়া হয়েছে।
অনেকের কাছে জমির বৈধ দলিল থাকার পরও তারা নিজেদের জমিতে যেতে বা ভোগদখল করতে পারছেন না।
ফলে হাজার হাজার একর জমি অন্যদের দখলে চলে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
রেবেকা সরেন বলেন, অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্রও উদ্বেগজনক। দিনমজুরি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। এর ওপর কাজের সুযোগও কমে গেছে।
সরকারি সহায়তা ও অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে তিনি শুধু রাষ্ট্র বা সমাজের দিকে তাকিয়ে না থেকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজেদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
তার মতে, শিক্ষা, অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান, সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকার বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সহজ-সরল ও উদার মানসিকতার সুযোগ যেন কেউ নিতে না পারে, সে জন্য নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই ভূমি, অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
‘রাষ্ট্র চাইলে বিশেষ ব্যবস্থা করতে পারে’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত বলেন, আদিবাসীদের ক্ষেত্রে মূল জনগোষ্ঠী থেকে তাদের কিছুটা আলাদা হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
প্রথা ও সংস্কৃতিগত ভিন্নতার কারণে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। এর সঙ্গে ভাষাগত, ভূখণ্ডজনিত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যও রয়েছে।
তার মতে, এসব কারণে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একই অবস্থান থেকে প্রতিযোগিতা করা অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সংবিধান তাদের জন্য বিশেষ বিধান করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা রাখেনি। রাষ্ট্র চাইলে বিশেষ ব্যবস্থা করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
অমিত দাস গুপ্ত বলেন, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। ২৩(ক) অনুচ্ছেদে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথা বলতে গিয়ে বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী, গোত্র ও সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে।
তার মতে, সাংস্কৃতিক দিক থেকে জাতিসত্তার সংজ্ঞায় ‘আদিবাসী’ শব্দটি সরাসরি আসেনি।
বিচারহীনতা দূর করতে কী প্রয়োজন?
অমিত দাস গুপ্তের মতে, অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করা, নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনের আওতায় আনা—বিচারহীনতা দূর করার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ যেন এমন ধারণা নিয়ে বসবাস না করেন যে তার অভিযোগ গুরুত্ব পাবে না, কিংবা মামলা করেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাওয়া যাবে না—এটি নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
অ্যাডভোকেট প্রমিলা টুডো বলেন, শুধু আদিবাসীরাই ন্যায়বিচার পাচ্ছে না—বিষয়টি এমন নয়; সামগ্রিকভাবেই দেশে ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঘাটতি রয়েছে।
তবে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে আদিবাসীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও বেশি।
তার মতে, এখানে ভাষাগত সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে জমি সংক্রান্ত মামলায় যে ডকুমেন্ট উপস্থাপন করতে হয়, সেগুলো দিতে সমস্যা হয়।
অনেক সময় দলিলপত্র সঠিকভাবে তৈরি করা থাকে না। আবার আইনের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী তথ্য না থাকলে বিচার পাওয়াও কঠিন হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, সঠিক বিচার পাওয়ার সুযোগ থাকলেও অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে যেমন নাগরিককে সহায়তা করতে হবে, তেমনি নাগরিককেও সঠিক তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ন্যায়বিচার আদায় করে নিতে হবে।
সমস্যাটি শুধু ‘পিছিয়ে থাকা’ নয়
সমতলের আদিবাসীদের পরিস্থিতিকে শুধু ‘তারা পিছিয়ে আছে’—এই একটি বাক্যে ব্যাখ্যা করা যায় না।
কারণ এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভূমি হারানোর ইতিহাস, প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনার স্বীকৃতির ঘাটতি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, শিক্ষায় ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার নানা বাধা।
একটি পরিবার যখন জমি হারায়, তখন শুধু একটি সম্পদ হারায় না—হারায় কৃষিভিত্তিক জীবিকা।
জীবিকা হারালে পরিবারটি শ্রমবাজারে প্রবেশ করে।
অর্থনৈতিক দুর্বলতা তৈরি হলে শিক্ষার সুযোগ কমে।
শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকলে নতুন প্রজন্ম নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
ভাষা দুর্বল হলে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
আর এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে একটি জনগোষ্ঠী তার নিজস্ব সামাজিক শক্তি ও দৃশ্যমানতা হারাতে থাকে।
তাহলে সমাধানের পথ কোথায়?
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গবেষকদের বক্তব্যে কয়েকটি বিষয় বারবার সামনে এসেছে।
প্রথমত, সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যার জন্য কার্যকর ও বিশেষায়িত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, সরকারি ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রথাগত সামাজিক ও সামষ্টিক ভূমি মালিকানার বিষয়টি আইনগতভাবে কীভাবে সুরক্ষিত করা যায়, তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।
চতুর্থত, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা সমতলের আদিবাসী ভাষাগুলোর ক্ষেত্রেও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।
পঞ্চমত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আদিবাসী শিক্ষার্থীর নাম, ভাষা ও পরিচয়কে সম্মান করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, সরকারি চাকরির কোটা ও অন্যান্য সুযোগ বাস্তবে যাতে সমতলের আদিবাসীরা পান, সে জন্য পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে সহজ ও কার্যকর করা প্রয়োজন।
সপ্তমত, থানায় অভিযোগ গ্রহণ থেকে আদালতের বিচার পর্যন্ত ভাষাগত সহায়তা ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
অষ্টমত, সামাজিক বৈষম্য ও প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা দূর করতে বৃহত্তর সমাজে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
নবমত, আদিবাসীদের ভাষা, গান, উৎসব, ধর্মীয় আচার, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ইতিহাস সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
সমতলের আদিবাসীরা হারিয়ে যায়নি।
সাঁওতাল পাড়া আছে, ওরাঁও গ্রাম আছে, মুন্ডা বসতি আছে, গারো অধ্যুষিত অঞ্চল আছে। এখনও তাদের উৎসব হয়, গান হয়, নিজস্ব আচার পালিত হয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গল্প ও স্মৃতি বেঁচে থাকে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—তাদের নিজেদের ভূমিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ কতটা আছে?
নিজেদের ভাষায় তাদের সন্তানরা কতটা শিক্ষা পায়?
নিজেদের পরিচয় রাষ্ট্রীয় কাগজে কতটা স্বীকৃতি পায়?
নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে তারা কতটা মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে?
আর কোনো অন্যায় হলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অভিযোগকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী শুধু সাংস্কৃতিক স্মৃতি হিসেবে টিকে থাকবে, নাকি ভূমি, শিক্ষা, অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচারে সমঅধিকার নিয়ে একটি দৃশ্যমান জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারবে।
সমতলের আদিবাসীদের অদৃশ্য হয়ে পড়ার গল্প তাই শুধু একটি জনগোষ্ঠীর গল্প নয়। এটি ভূমি, পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সম্পর্কেরও গল্প।
জেটিভি নিউজ বাংলা মনে করে, এই বাস্তবতা নিয়ে আরও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান, জনআলোচনা ও নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।
—জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য,সাহস, সংযোগ…….
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম