আবাসন সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে: প্রধানমন্ত্রী
দেশের নগর ও শহরাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান আবাসন সংকট মোকাবিলায় সরকারের একার পক্ষে সব দায়িত্ব পালন করা কিছুটা কঠিন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সংকট সমাধানে আবাসন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি উদ্যোক্তা, প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত অংশগ্রহণ থাকলে দেশের নগরাঞ্চলের আবাসন সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকার ওপর জনসংখ্যা ও আবাসনের চাপ কমাতে ঢাকার আশপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আয়োজিত বিশ্ব বসতি দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য হলো—‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’।
গাছের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা
বিশ্ব বসতি দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে একটি ‘স্বর্ণচাঁপা’ গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এর মধ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নগরায়ণের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়। পরে তিনি দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং দেশের আবাসন পরিস্থিতি, নগরায়ণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত বসতি গড়ে তোলার বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সর্বজনীন আবাসন নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবার জন্য বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত ও নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু বসবাসের জন্য একটি ঘর বা ভবন তৈরি করলেই আবাসন নিশ্চিত হয় না; সেই আবাসনের সঙ্গে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় মৌলিক সেবা ও পরিষেবার সুযোগও থাকতে হবে।
তিনি বলেন, সবার জন্য বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত, নিরাপদ এবং মৌলিক সেবা-পরিষেবা সংবলিত বাসস্থান তথা সর্বজনীন আবাসন নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার।
এই মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করেছে বলেও জানান তিনি।
ব্লকভিত্তিক আবাসনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে
প্রধানমন্ত্রী জানান, সর্বজনীন আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্লকভিত্তিক আবাসন উৎসাহিত করার পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক পার্ক ও খেলার মাঠ স্থাপন করা হচ্ছে।
পরিকল্পিত আবাসন এলাকায় মানুষের বসবাসের পাশাপাশি বিনোদন, খেলাধুলা ও উন্মুক্ত পরিবেশের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে নির্ধারিত জোনে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আবাসন, কর্মসংস্থান, শিল্প, বিনোদন ও নাগরিক সুবিধাকে পরিকল্পিতভাবে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার মাধ্যমে বাসযোগ্য নগর ও জনপদ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার পর্যায়ক্রমে গৃহীত সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে—এমন বিশ্বাস রয়েছে তার।
আবাসন উন্নয়নে পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব
বাসযোগ্য আবাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আবাসন উন্নয়ন করতে গিয়ে যাতে প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রকৃতি ও পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়েই জাতীয় গৃহায়ন এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভাগীয় শহর এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলা হচ্ছে।
এর মাধ্যমে দেশের বড় শহরগুলোর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও পরিকল্পিতভাবে আবাসন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশকে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা—উভয়েরই মুখোমুখি করছে।
বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রভাব দেশের নগরায়ণ, আবাসন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও পড়তে পারে। এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও নগর এলাকার বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিশেষ করে সর্বজনীন বাসস্থান নিশ্চিত করতে নানাবিধ পদক্ষেপ দ্রুততার সঙ্গে এবং স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়নের জন্য সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রতিটি অঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারায় আনার উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিদ্যমান নগরায়ণ পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েছে।
শুধু রাজধানী ঢাকা বা কয়েকটি বড় শহরকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য কেন্দ্রীভূত নগরায়ণ নয়; বরং বিকেন্দ্রীভূত, ভারসাম্যপূর্ণ নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন।
অর্থাৎ মানুষের বসবাস, কর্মসংস্থান, শিল্প, শিক্ষা, নাগরিক সুবিধা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যাতে কেবল রাজধানী বা নির্দিষ্ট কয়েকটি শহরকেন্দ্রিক না থাকে, সে লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নয়ন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকার আশপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ
রাজধানী ঢাকার ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও নগরায়ণের চাপ কমাতে ঢাকার আশপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ইতোমধ্যে সারা দেশের জন্য স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি ঢাকার আশপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো নগরায়ণকে একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে কেন্দ্রীভূত না রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও শহরের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
সরকারের একার পক্ষে আবাসন সংকট মোকাবিলা কঠিন
প্রধানমন্ত্রী আবারও বলেন, দেশের নগর বা শহরাঞ্চলের আবাসন সংকট মোকাবিলা সরকারের একার পক্ষে কিছুটা কষ্টসাধ্য।
তাই এ ক্ষেত্রে আবাসন খাত-সংশ্লিষ্ট বেসরকারি উদ্যোক্তাসহ সব অংশীজনের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তার মতে, সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে বেসরকারি খাত, আবাসন ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের কার্যকর সমন্বয় থাকলে দেশের আবাসন সংকট মোকাবিলা আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব।
পরিকল্পিত নগরায়ণের ওপর গুরুত্ব
বিশ্ব বসতি দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নগরায়ণ হতে হবে পরিকল্পিত, পরিবেশসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ।
মানুষের বসবাসের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিকদের মৌলিক সেবা-পরিষেবা, পার্ক, খেলার মাঠ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও পরিকল্পিত আবাসনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সরকার পর্যায়ক্রমে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়নকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যারা
বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠানে বিশ্ব বসতি দিবসের তাৎপর্য, দেশের আবাসন পরিস্থিতি, পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ আবাসন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সরকারের আবাসন পরিকল্পনায় একদিকে যেমন সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও সর্বজনীন বাসস্থান নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, অন্যদিকে পরিবেশ সুরক্ষা, বিকেন্দ্রীভূত নগরায়ণ, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং ঢাকার আশপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য,সাহস, সংযোগ……
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম