খুলনার দাকোপে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও যাত্রী সংকটে বন্ধের পথে নদীপথের ট্রলার চলাচল
নিজস্ব প্রতিবেদক | খুলনা
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় জেলা খুলনার দাকোপ উপজেলায় নদীপথে ট্রলার পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সাধারণ যাত্রী পারাপারে ব্যবহৃত ট্রলারগুলোর জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন মালিক ও চালকেরা। যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়া এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক মাঝি ট্রলার ঘাটে বসিয়ে রেখে জীবিকার তাগিদে দিনমজুরি কিংবা বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন।
ট্রলারচালক সুজিত মন্ডল, গফ্ফার হোসেন গাজী, আব্দুল্লাহ গাজী, এলাহী বক্স, খালেক ও বিধান সরদার জানান, সমুদ্র উপকূলীয় পৃথক তিনটি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত দাকোপ উপজেলার নদীপথে আগের মতো আর যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ট্রলার চালিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনসংলগ্ন কালাবগী থেকে চালনা লঞ্চঘাট পর্যন্ত নদীপথের দূরত্ব প্রায় ৪১ কিলোমিটার। এ পথে যাত্রী পরিবহনের জন্য ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৯টি ট্রলার ছিল। নদীপথে একবার যাতায়াত করতেই একটি ট্রলারে ৮ থেকে ৯ লিটার ডিজেল খরচ হয়। কালাবগী থেকে চালনা লঞ্চঘাট পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া নির্ধারিত ছিল ৮০ টাকা। যখন এ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা। বর্তমানে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ২০ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকায়।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বাধ্য হয়ে নদীপথের দূরত্ব অনুযায়ী যাত্রীপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া নিতে হচ্ছে। কালাবগী থেকে চালনা পর্যন্ত প্রতিটি ট্রলারে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন যাত্রী পাওয়া যায়। চালকেরা জানান, এ সংখ্যক যাত্রী নিয়ে ট্রলার চালাতে থাকলে কিছুদিন পর তাঁদের পথে বসতে হবে।
তাঁদের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে এ রুটে মাত্র ৮ থেকে ৯টি ট্রলার চলাচল করছে। আগে আরও ট্রলার চলাচল করলেও লোকসানের কারণে সেগুলোর মালিকেরা অন্যত্র চলে গেছেন অথবা ট্রলার চালানো বন্ধ রেখেছেন।
ট্রলার চালানো বন্ধ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের স্থায়ী ব্যয় রয়েছে। যাত্রী থাকুক বা না থাকুক, প্রতিদিন ট্রলার চালাতে একজন চালককে ৬৫০ টাকা এবং একজন কর্মচারীকে ৫০০ টাকা বেতন দিতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি জ্বালানি খরচ। ফলে সীমিতসংখ্যক যাত্রী নিয়ে ট্রলার চালিয়ে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুকনো মৌসুমে সড়কপথে ঝুঁকছেন যাত্রীরা
নদীপথ এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য বিকল্প কাঁচা সড়ক রয়েছে। তবে বর্ষাকালে এসব সড়ক দিয়ে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে বর্ষা মৌসুমে এ নদীপথে যাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকে। কিন্তু বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ায় নদীপথের যাত্রীরা এখন দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে সড়কপথ বেছে নিচ্ছেন।
এতে নদীপথে ট্রলার চালিয়ে জ্বালানি তেলের খরচ ওঠানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। আয় কমে যাওয়ায় ট্রলারমালিক, চালক ও কর্মচারীদের পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে ট্রলারের মাঝির কাজ ছেড়ে দিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য বিকল্প পেশায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। সব মিলিয়ে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও নদীপথে যাত্রীসংকটের কারণে হতাশ হয়ে পড়েছেন ট্রলারমালিক ও চালকেরা।
কালাবগী থেকে সড়কপথে চালনায় আসা ব্যবসায়ী আকবর সরদার বলেন, “ট্রলারে এলে বেশি অর্থ খরচ হয়। পাশাপাশি সময়ও বেশি লাগে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এলাকার রাস্তাঘাট কাদামাটিতে ভরে যাওয়ায় তখন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হলেও ট্রলারে যাতায়াত করতাম। তখন ট্রলারভাড়া ছিল জনপ্রতি ৮০ টাকা। বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ট্রলারভাড়া আগের তুলনায় জনপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা বেড়েছে। গ্রামের রাস্তাঘাট শুকিয়ে যাওয়ায় খরচ কমাতে এখন সড়কপথে ইঞ্জিনচালিত ভ্যানে যাতায়াত করছি।”
যাত্রী কমায় লোকসানে ট্রলারচালকেরা

কালাবগী থেকে চালনা পর্যন্ত যাত্রীবাহী ট্রলারের চালক বকুল মল্লিক বলেন, “একসময় এ নদীপথে ট্রলারে যাত্রী বেশি হতো। যাত্রীবাহী ট্রলার চালিয়ে আমরা লাভবান হয়েছি। কিন্তু শুকনো মৌসুমে নদীপথের যাত্রীরা চলাচল করতে চান না। সময় বাঁচাতে তাঁরা এখন সড়কপথ বেছে নিয়েছেন। ফলে নদীপথে ট্রলারে তেমন যাত্রী হচ্ছে না। বর্তমানে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় ট্রলারের ভাড়াও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। এতে ট্রলারে আগের চেয়েও যাত্রী কম হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “ইতিমধ্যে এ নদীপথের অধিকাংশ ট্রলারমালিক ও চালক তাঁদের ট্রলার পরিচালনা বন্ধ করে অন্য পেশায় চলে গেছেন। বর্তমানে ট্রলার চালিয়ে যে আয় হচ্ছে, তাতে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমার ট্রলারটি ডাঙায় তুলে রেখে দিনমজুরের কাজ করব।”
চালনা লঞ্চঘাটের রিজার্ভ ও ভাড়ায়চালিত ট্রলারের মালিক জাফর হাওলাদার বলেন, “তেলের দাম বাড়ার পর ট্রলারের ভাড়াও স্বাভাবিকভাবে বাড়াতে হয়েছে। ট্রলার চালিয়ে এখন আর আগের মতো আয় হচ্ছে না। ফলে সাধারণ যাত্রীরাও আগের মতো ট্রলার রিজার্ভ করছেন না। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার-পরিজন নিয়ে পথে বসতে হবে। তাই ভাবছি, দীর্ঘ বছরের এ পেশা ছেড়ে দিয়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে বিকল্প পেশায় যাব।”
খেয়া পারাপারেও বেড়েছে ভাড়া

দাকোপের লক্ষ্মীখোলা খেয়াঘাটেও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। ওই ঘাটের ট্রলারচালক কামরুল ইসলাম বলেন, “আগে নদী পারাপারে জনপ্রতি ৫ টাকা নেওয়া হতো। হঠাৎ ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন বাধ্য হয়ে জনপ্রতি ৬ থেকে ৭ টাকা করে নিতে হচ্ছে।”
ডিজেলের ব্যয় বাড়ায় বিপাকে খুচরা ব্যবসায়ীরাও
চালনা বাজারের খুচরা ডিজেল ব্যবসায়ী নিমাই সাহা জানান, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আগে খুলনার যমুনা ডিপো থেকে ২০০ লিটারের একটি ব্যারেল ডিজেল কিনতে তাঁর খরচ হতো ২২ হাজার ৩০০ টাকা। বর্তমানে দাম বৃদ্ধির কারণে একই ডিপো থেকে ওই পরিমাণ ডিজেল কিনতে হচ্ছে ২৬ হাজার ৩০০ টাকায়।
তিনি জানান, খুলনা থেকে চালনা বাজার পর্যন্ত প্রতি ব্যারেল ডিজেল পরিবহনে আরও ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ হয়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ক্রেতাদের কাছ থেকেও লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেশি নিতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং যাত্রীসংকটের কারণে দাকোপের কালাবগী-চালনা নদীপথের যাত্রী পরিবহন খাত সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত ট্রলারমালিক ও চালকেরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তাঁদের অনেককেই পেশা পরিবর্তন করতে হবে। এতে নদীপথে যাত্রী পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি স্থানীয় মানুষের যাতায়াতব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে……..
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম