পুলিশের সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, ফ্যামিলি কার্ড-কৃষক কার্ড ও পরিবেশ সুরক্ষার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরলেন বিএনপির এই নেতা
রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ফ্রি চিকিৎসাসেবা (মেডিক্যাল ক্যাম্প) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে পুলিশ বাহিনীর প্রধানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, সস্তা বাহবা পাওয়া কিংবা কৃতিত্ব নেওয়ার উদ্দেশ্যে আইজিপির দেওয়া বক্তব্য দেশের ক্ষতি করবে। এ ধরনের বক্তব্য সরকারকে স্বস্তি দেওয়ার পরিবর্তে বিব্রত ও ভীতিকর পরিস্থিতির মুখে ফেলতে পারে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে অনুষ্ঠিত ওই কর্মসূচিতে রিজভী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা, অপরাধ দমন, তরুণদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেন। একই সঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে দেশের পুনর্গঠনে তরুণ সমাজকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আইজিপির বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন রিজভীর
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশ প্রধানের সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, পুলিশ বাহিনীর প্রধান যখন একটি সরকারের পক্ষে সব কথা বলেন, তখন তা সরকারকে স্বস্তি দেওয়ার পরিবর্তে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্যের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীতে অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে এবং নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। পুলিশ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ও নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারলে সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা সম্ভব।
রিজভীর বক্তব্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো আইন অনুযায়ী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের প্রতি অযাচিত পক্ষপাত না দেখিয়ে পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সস্তা কৃতিত্ব নেওয়া কিংবা বাহবা পাওয়ার জন্য দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে বক্তব্য দেওয়া হলে তা দেশের ক্ষতি করবে। এতে সরকার স্বস্তি পাওয়ার পরিবর্তে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে বাহবা অর্জনের চেষ্টা নয়, বরং দায়িত্বশীলতা, নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে—এমন বক্তব্যই তুলে ধরেন বিএনপির এই নেতা।
তরুণদের দক্ষ করে দেশের উৎপাদন ও উন্নয়নে যুক্ত করার পরিকল্পনা
বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে রিজভী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তরুণদের স্বাধীনভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং দেশের উৎপাদন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করাই বিএনপির মূল লক্ষ্য।
তিনি মনে করেন, দেশের উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে তরুণ সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের কেবল কর্মসূচি বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ না রেখে দক্ষতা, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তাঁদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
রিজভী বলেন, জাতির পুনর্গঠনে তরুণ সমাজকে বিশৃঙ্খলার অংশ হিসেবে নয়, বরং উন্নয়নের মূল অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের স্বাধীনভাবে নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ দেওয়া এবং তাঁদের সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
তাঁর বক্তব্যে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে তাঁদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
‘মানবিক বাংলাদেশ’ গঠনে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের কথা
তারেক রহমানের ‘মানবিক বাংলাদেশ’ রূপকল্পের কথা তুলে ধরে রিজভী বলেন, প্রান্তিক কৃষক ও দরিদ্র মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের সহায়তা করা এবং কেউ যাতে অনাহারে বা নিরন্ন অবস্থায় না থাকে, তা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, দরিদ্র পরিবার ও প্রান্তিক কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ আর্থিক ও সামাজিকভাবে উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
রিজভী আরও উল্লেখ করেন, অর্থনীতিবিদদের গবেষণাতেও উঠে এসেছে যে, এ ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে দেশে দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমে আসতে পারে। তাঁর বক্তব্যে দরিদ্র মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বিএনপির এই নেতা ‘মানবিক বাংলাদেশ’ গঠনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এমন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন, যার মাধ্যমে দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় কোটি কোটি গাছ ও তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা
পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়েও বক্তব্য দেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় কোটি কোটি গাছ ও তালগাছ লাগানোর মতো দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষা ও দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি এ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে পরিবেশ সংরক্ষণকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি উঠে আসে।
যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, যুবদলের নেতাকর্মীরা এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।
বহুদলীয় গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে বিএনপি
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে রিজভী বলেন, বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই অতীতে আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল পুনরায় রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছিল এবং সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা ফিরে এসেছিল।
বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে রিজভী বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গণতান্ত্রিক চর্চা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মানবিক ও উৎপাদনমুখী কর্মসূচির প্রত্যাশা
জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির প্রশংসা করেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, যুবদলের প্রতিটি নেতাকর্মী রক্তদান, মানবিক সেবা, বৃক্ষরোপণ এবং উৎপাদনমুখী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ফ্রি চিকিৎসাসেবা বা মেডিক্যাল ক্যাম্প আয়োজনকে কেন্দ্র করে মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের বিষয়টি সামনে আসে। রিজভীর বক্তব্যে সংগঠনের নেতাকর্মীদের সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হওয়ার প্রত্যাশা প্রকাশ পায়।
রক্তদান, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পরিবেশ রক্ষা এবং উৎপাদনমুখী উদ্যোগের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে যুবসমাজকে দেশের মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, এসব কর্মসূচি শুধু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের মানুষের উপকারে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
জাতীয়তাবাদী যুবদলের ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ এমপি।
যুবদলের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সভাপতি মোনায়েম মুন্না, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন এমপি, সহসভাপতি জিয়াউর রহমান জিয়া, ফেরদৌস মুন্না ও এজমাল হোসেন পাইলট।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. তারেকুজ্জামান, আবুল মনসুর খান দীপক ও খন্দকার আল আশরাফ মামুন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন যুবদলের সহসাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী, প্রচার সম্পাদক আল মেহেদী তালুকদার, প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক আরাফাত বিল্লাহ খান, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান সুমন এবং নির্বাহী কমিটির সদস্য এবিএম মহসিন বিশ্বাসসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা।
নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ফ্রি চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের উদ্বোধনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, তরুণদের উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে রিজভীর বক্তব্য অনুষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য বিষয় হয়ে ওঠে।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে…….
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম