সুপার এল নিনোর আশঙ্কা, আগামী ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে ৩ লাখ ৭৩ হাজার মানুষের মৃত্যুর পূর্বাভাস
নিজস্ব প্রতিবেদক | জেটিভি নিউজ বাংলা
ছবি ঃ সংগৃহীত
পৃথিবীর আবহাওয়াকে প্রভাবিত করা প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনাগুলোর মধ্যে চলতি বছরের এল নিনো ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। সমুদ্র থেকে অস্বাভাবিক পরিমাণ তাপ নির্গমনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র খরা, বন্যা ও ভয়াবহ ঝড়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত ৩ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবে অভিহিত করছেন। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের তৈরি একটি মানচিত্রে এল নিনোর কারণে বিশ্বের কোন কোন অঞ্চলে মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, তা তুলে ধরা হয়েছে।
‘এল নিনো হিট মর্টালিটি ট্র্যাকার’ নামে প্রকাশিত ওই পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, তীব্র তাপদাহের কারণে আগামী ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বৈশ্বিক দক্ষিণ বা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো।
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, চরম তাপদাহের প্রাণঘাতী প্রভাব আগে থেকে অনুমান করতে পারা একটি বড় অর্জন। এর মাধ্যমে কোন এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাণহানির ঘটনা ঘটার আগেই নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে যে সুপার এল নিনোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, এই ট্র্যাকার সে সম্পর্কেই তথ্য সরবরাহ করছে।
ভারত, নাইজেরিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর তাপদাহে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে। এর মধ্যে ভারত অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।
ট্র্যাকারটির দাবি, অক্টোবর থেকে মার্চের মধ্যে ভারতে অতিরিক্ত গরমের কারণে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এসব মৃত্যুর বেশির ভাগই ঘটতে পারে আগামী মার্চ মাসে।
অন্যদিকে, নাইজেরিয়ায় সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫৬ হাজার বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ভারতে সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যার সঙ্গে নাইজেরিয়ার পূর্বাভাসের ব্যবধান খুবই কম।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেও এল নিনোর তাপদাহের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ২৯ হাজার মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে। এ ছাড়া ব্রাজিলে সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা ১৯ হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মুম্বাইয়ে বাড়তে পারে বায়ুদূষণ
এল নিনোর প্রভাব শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি কিংবা প্রাণহানির ঝুঁকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণের পরিস্থিতিও আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে এক আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ জানান, এল নিনোর প্রভাবে ভারতের মুম্বাই শহরের বায়ুদূষণ পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
এসএএফএআর-এর প্রতিষ্ঠাতা-প্রকল্প পরিচালক এবং এনআইএএস, আইআইএসসি-এর চেয়ার প্রফেসর ড. গুফরান বেগ জানান, মুম্বাইয়ের মতো শহরে বৃহৎ পরিসরে বাতাসের চলাচল ধীর হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে শক্তিশালী বাতাসের মাধ্যমে দূষিত বায়ু ছড়িয়ে যাওয়ার যে প্রাকৃতিক সুবিধা শহরটি পেয়ে থাকে, তা কমে যেতে পারে।
১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর সতর্কতা
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ইতোমধ্যে এল নিনোর তীব্রতা নিয়ে সতর্ক করেছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের পর এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো। তবে এর প্রধান প্রভাব বা চরম পর্যায় এখনও আসেনি।
জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক এই সংস্থাটি জানিয়েছে, ডিসেম্বরের সম্ভাব্য চরম পর্যায়ের আগে এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে।
একই সঙ্গে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাব ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
কীভাবে প্রভাব ফেলে এল নিনো?
এল নিনো মূলত মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের প্রভাব বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপর পড়ে।
সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনোর মতো জলবায়ুগত পরিস্থিতি তৈরি হয়। এটি সাধারণত প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হতে পারে।
এল নিনো এবং এর বিপরীত পর্যায় ‘লা নিনা’—এই দুই অবস্থার মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের জলবায়ুগত পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে থাকে। এই দুই পর্যায়ের মধ্যবর্তী সময়ে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থায় থাকতে পারে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর সম্ভাব্য তীব্র প্রভাব মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে আগাম প্রস্তুতি, তাপদাহ মোকাবিলার ব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সূত্র: এনডিটিভি
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে…….
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম