কালিয়াকৈরে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
পাঁচ ঘণ্টা অবরোধের পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক, ১৫ কিলোমিটার যানজটে দুর্ভোগে যাত্রীরা
গাজীপুর প্রতিনিধি:
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলা এই আন্দোলনের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে মহাসড়কের গাজীপুর থেকে বোর্ডঘর পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। অবশেষে শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং মহাসড়কে যানবাহন চলাচল পুনরায় শুরু হয়।
যেভাবে শুরু হয় শ্রমিকদের আন্দোলন
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিক প্রথমে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের মূল দাবি ছিল, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে।
প্রথমে কয়েকটি কারখানার শ্রমিক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শত শত শ্রমিক আন্দোলনে যোগ দেন। একপর্যায়ে শ্রমিকদের উপস্থিতি বাড়তে থাকলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর ও মৌচাকসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়।
এ সময় আন্দোলনরত শ্রমিকরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানান। পরে বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নিলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
মহাসড়কে আগুন, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
বিক্ষোভের একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের একাংশ মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে দেন। পাশাপাশি পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ সময় পুলিশের কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয় বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের কারণে মহাসড়ক এবং আশপাশের এলাকায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়।
১৫ কিলোমিটার যানজটে আটকে শত শত যানবাহন
শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুর থেকে বোর্ডঘর পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র যানজট তৈরি হয়। দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে যানজটে আটকে থাকায় যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা দীর্ঘ সময় যানবাহনের মধ্যে আটকে থেকে ভোগান্তিতে পড়েন। জরুরি কাজে বের হওয়া যাত্রীদের পাশাপাশি দূরপাল্লার যানবাহনের যাত্রীরাও বিপাকে পড়েন। মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় আশপাশের সড়কগুলোতেও এর প্রভাব পড়ে।
অন্তত ১৫টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা
শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের প্রভাব পড়ে আশপাশের শিল্পকারখানাগুলোতেও। পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্দোলনপ্রবণ এলাকার অন্তত ১৫টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এতে ওই কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।
কেন ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবি শ্রমিকদের?
আন্দোলনরত শ্রমিকদের ভাষ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বাসাভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, যাতায়াত ও পরিবারের অন্যান্য খরচ। কিন্তু সেই তুলনায় তাদের বেতন বাড়েনি। বর্তমান বেতন দিয়ে সংসারের নিত্যদিনের খরচ মেটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।
শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে পরিবার নিয়ে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে হলে ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা জরুরি। এ দাবিতেই তারা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছেন।
পাঁচ ঘণ্টা পর স্বাভাবিক হলো যান চলাচল
দীর্ঘ সময় বিক্ষোভ, অবরোধ ও সংঘর্ষের পর আন্দোলনরত শ্রমিকরা একপর্যায়ে মহাসড়ক থেকে সরে যান। এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের প্রচেষ্টায় শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
তবে শ্রমিকদের মূল দাবি—ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ—নিয়ে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট আবারও পোশাকশ্রমিকদের বেতন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে……
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম