৯ মাস যুদ্ধ করেও শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান জুটল না বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারের!
জেটিভি নিউজ বাংলা ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
যে মানুষটি একাত্তরে দীর্ঘ ৯ মাস অস্ত্র হাতে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন, সেই বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায় হলো রাষ্ট্রীয় সম্মান ছাড়াই। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারের (৭৮) মরদেহ গার্ড অব অনার ছাড়াই দাফনের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্বজন, সহযোদ্ধা ও এলাকাবাসী। পরিবারের অভিযোগ, যথাযথ উদ্যোগ ও সমন্বয়ের অভাবে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তার প্রাপ্য শেষ সম্মানটুকু থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। তবে উপজেলা প্রশাসনের দাবি, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়ার সুযোগ না থাকায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানী ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি যোগাযোগ ও আইন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষ দিনগুলো বার্ধক্যের কারণে ঢাকায় ছেলের সঙ্গেই কাটাচ্ছিলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় প্রথম জানাজা শেষে তার মরদেহ নেওয়া হয় কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহালক্ষীপাড়া গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু ঢাকা থেকে মরদেহ গ্রামে পৌঁছাতে বিকেল সাড়ে ৫টা বেজে যায়। এরপর নানা অপেক্ষা ও প্রত্যাশার মধ্যেই শেষ পর্যন্ত কোনো গার্ড অব অনার ছাড়াই দাফন করা হয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।
এ ঘটনায় গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন মরহুমের ভাই শাহজাহান। তিনি বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের প্রত্যাশা ছিল, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ভাইকে শেষ বিদায় জানানো হবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
তার ভাষায়, ‘আমরা চেয়েছিলাম আমার ভাইকে শেষ সম্মানটুকু জানিয়ে চিরবিদায় দিতে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। আমরা আজ লজ্জিত, যে মানুষটি ৯ মাস অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন করল, সে তার প্রাপ্য সম্মানটুকুও পেল না!’
একই ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয় আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মোল্লা। তিনি বলেন, একজন সহযোদ্ধার এমন বিদায় অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া সম্ভব না হলেও প্রশাসনের কর্মকর্তারা অন্তত উপস্থিত হয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারতেন।
তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া না গেলেও অন্তত প্রশাসনের লোক এসে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে যেতে পারত, কিন্তু তাও করা হয়নি। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সহযোদ্ধার এমন অমর্যাদা সহ্য করার মতো নয়।’
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া মাস্টার জানান, গার্ড অব অনার ও সশস্ত্র সালামের ব্যবস্থা করার জন্য তারা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করেছিলেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে অনুরোধও জানানো হয়েছিল। কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলাম তাদের জানিয়েছিলেন, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ব্রাহ্মণপাড়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল হক বলেন, তিনি মরহুমের জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার না দেওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে ব্রাহ্মণপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ফারুক হোসেন জানান, গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে একটি পিকআপভর্তি পুলিশ সদস্য পাঠানো হয়েছিল। পাশাপাশি পুলিশ লাইন থেকে বিউগলের সুর বাজানোর জন্য একটি দলও এসেছিল।
কিন্তু উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ উপস্থিত না থাকায় পুলিশ এককভাবে গার্ড অব অনার দিতে পারেনি। তবে পুলিশের সদস্যরা মরহুমের জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুন্নী ইসলাম বলেন, ‘সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া হয় না। তারপরও আমরা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, কিন্তু ঢাকা থেকে লাশ আনা নিয়ে দ্বিধা ছিল। মাগরিবের পর কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করেনি, তাই দেওয়া সম্ভব হয়নি।’
জেটিভি নিউজ বাংলার সম্পাদক ও প্রকাশকের পর্যবেক্ষণ
রুমন জোয়ার্দ্দার জনির গভীর শোক, সমবেদনা ও ক্ষোভ
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারের শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বা গার্ড অব অনার না দেওয়ার অভিযোগে গভীর দুঃখ, শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন জেটিভি নিউজ বাংলার সম্পাদক ও প্রকাশক রুমন জোয়ার্দ্দার জনি।
তিনি বলেন,
“মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। ১৯৭১ সালে নিজের জীবন বাজি রেখে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে তাঁরা আমাদের উপহার দিয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশ, দিয়েছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম, পতাকা ও মানচিত্র। তাঁদের অসীম ত্যাগ ও আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে পারছি।
১৯৭১ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধারা
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সেই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতেই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জীবনের শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি আমাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে।
আমি নিজেও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তাই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে এমন ঘটনার কথা শুনে ব্যক্তিগতভাবে গভীর কষ্ট, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি। নিজের কাছে বারবার প্রশ্ন জাগছে—যাঁরা জীবন বাজি রেখে এই দেশ স্বাধীন করেছিলেন, আজ তাঁদেরই যদি শেষ বিদায়ে যথাযথ সম্মান নিশ্চিত না হয়, তাহলে আমরা কোন বাংলাদেশে বসবাস করছি?
আরও একটি প্রশ্ন আমাকে তাড়িত করছে—তাহলে কি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের মর্যাদা আজ উপেক্ষিত হচ্ছে? স্বাধীনতার চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কি আমরা হারিয়ে ফেলছি? এমনকি মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতেই চলে যাচ্ছে?
আমি মনে করি, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মান রক্ষা করা শুধু তাঁর পরিবারের দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনেরও নৈতিক দায়িত্ব। একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টি কোনোভাবেই অবহেলা বা সমন্বয়হীনতার কারণে ব্যাহত হওয়া উচিত নয়।
আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় তদন্ত প্রত্যাশা করছি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে জানতে চাই, কেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তাঁর প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়ে বিদায় জানানো সম্ভব হলো না?
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমার প্রত্যাশা, বাংলাদেশে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে যেন জীবনের শেষ বিদায়েও সম্মান পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে না হয়। তাঁদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”
রুমন জোয়ার্দ্দার জনি
সম্পাদক ও প্রকাশক
জেটিভি নিউজ বাংলা
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে……..
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম