৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবসে জাসদের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মহানায়ক কর্নেল তাহের: জাসদের সভায় বক্তারা
নিজস্ব প্রতিবেদক | জেটিভি নিউজ বাংলা
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে আলোচনা সভা করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটি। শনিবার (৭ নভেম্বর) বিকেল ৪টায় রাজধানীর জিপিওর সামনে শহীদ কর্নেল তাহের মিলনায়তনে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা ১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মহানায়ক হিসেবে শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের নাম উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে অভ্যুত্থানের পটভূমি, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা, জাসদের অবস্থান, ১২ দফা দাবি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তাঁরা।
আলোচনা সভার শুরুতে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মহানায়ক শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাসদের নেতাকর্মীরা।
জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মীর হোসাইন আকতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সঞ্চালনা করেন দলের জনসংযোগ বিষয়ক সম্পাদক শরিফুল কবির স্বপন।
সভায় বক্তব্য দেন জাসদের সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শফি উদ্দিন মোল্লা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শওকত রায়হান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নঈমুল আহসান জুয়েল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর রহমান চুন্নু, জাতীয় শ্রমিক জোটের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুজ্জামান বাদশা, জাসদের কোষাধ্যক্ষ মনির হোসেন, দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন, জাসদ ঢাকা মহানগর পশ্চিমের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আবু হানিফ, জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কাজী সাইমুল হক, যুব জোটের সহ-সভাপতি শুভংকর দে বাপ্পা, শ্রমিক জোটের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সরদার খোরশেদ, জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পারভেজ আক্তার শিল্পী এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ)-এর সহ-সভাপতি গোলাম কিবরিয়াসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান নিয়ে জাসদ নেতাদের বক্তব্য
জাসদ নেতা নেত্রী
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান ছিল ক্ষমতালোভী ও উচ্ছৃঙ্খল সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে চলমান বিশৃঙ্খলা থামানো এবং ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা বৈষম্যমূলক ও নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তনের লক্ষ্যে সাধারণ সিপাহিদের একটি সুশৃঙ্খল বিপ্লবী প্রচেষ্টা।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে মৃত্যুঞ্জয়ী সেক্টর কমান্ডার, জাসদ নেতা ও বিপ্লবী শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে এ ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। দেশের তৎকালীন সংকটময় পরিস্থিতিতে জাসদ বিপ্লবী দৃঢ়তা নিয়ে বিদ্রোহী সিপাহিদের পাশে দাঁড়িয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তাঁরা।
বক্তারা দাবি করেন, জাসদের বলিষ্ঠ ও ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে সেদিন ক্ষমতালোভী সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে চলা উন্মত্ততা, বিশৃঙ্খলা, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, কামড়াকামড়ি ও রক্তপাত বন্ধ হয়েছিল। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমানসহ অসংখ্য সামরিক কর্মকর্তা ও সৈনিকের জীবন রক্ষা পেয়েছিল।
১২ দফা দাবি ও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ
সভায় বক্তারা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহিদের উত্থাপিত ১২ দফা দাবি এবং অভ্যুত্থানের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও বক্তব্য দেন।
তাঁরা বলেন, সিপাহিদের ১২ দফা দাবি এবং সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের সঙ্গে কারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, ঔপনিবেশিক আমলের রাষ্ট্রকাঠামো কারা বহাল রেখেছিল—সেসব বিষয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বক্তাদের অভিযোগ, সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ও সিপাহিদের ১২ দফা দাবির সঙ্গে পরবর্তী সময়ে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছিল। তাঁরা মনে করেন, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রকাঠামোয় যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি; বরং আগের বৈষম্যমূলক ও নিপীড়নমূলক কাঠামো বহাল রাখা হয়েছিল।
কর্নেল তাহেরের বিচার ও ফাঁসি নিয়ে জাসদের অভিযোগ
কর্নেল তাহের
আলোচনা সভায় বক্তারা শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
তাঁদের অভিযোগ, সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মহানায়ক কর্নেল আবু তাহেরকে অবৈধ ও বেআইনি সামরিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে একটি মিথ্যা মামলায় বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল। বক্তারা ওই বিচারকে প্রহসনমূলক বলে অভিহিত করেন এবং অভিযোগ করেন, ফরমায়েশি রায়ের মাধ্যমে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
তাঁরা বলেন, মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী একজন সেক্টর কমান্ডার এবং ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতা কর্নেল তাহেরের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়।
জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতাদের সাজা প্রসঙ্গ
সভায় জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খান, তৎকালীন সভাপতি মেজর এম এ জলিল, সাধারণ সম্পাদক আ স ম আবদুর রব, জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু, রবিউল আলম, মেজর জিয়াউদ্দিন, সার্জেন্ট ইউসুফ এবং কর্নেল আবু তাহেরসহ জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতাদের বিরুদ্ধে গৃহীত বিচারিক পদক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদি সাজা প্রদানের বিষয়টিও তুলে ধরেন বক্তারা।
তাঁদের বক্তব্য, এসব নেতার দীর্ঘমেয়াদি সাজা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেইমানি ও বিশ্বাসঘাতকতার একটি কালো অধ্যায় হিসেবে স্থান পেয়েছে। বক্তারা মনে করেন, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়গুলো ইতিহাসের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিপ্লবী রাজনীতির অনুপ্রেরণা কর্নেল তাহেরের আদর্শ
আলোচনা সভায় বক্তারা শহীদ কর্নেল আবু তাহেরের রাজনৈতিক আদর্শ ও বিপ্লবী চেতনার কথা স্মরণ করেন। তাঁরা বলেন, শহীদ কর্নেল তাহেরের শিক্ষা হলো বিপ্লবের দীক্ষা। তাঁর আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন বিপ্লবী রাজনীতির অনুপ্রেরণা হিসেবে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে।
বক্তারা আরও বলেন, সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; তাঁদের বিবেচনায় এটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ অভ্যুত্থানের ইতিহাস, সিপাহিদের ১২ দফা দাবি এবং কর্নেল তাহেরের ভূমিকা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁরা আলোচনায় উল্লেখ করেন।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও কর্মসূচি
এদিকে, ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জাসদের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কমিটির উদ্যোগেও নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
এসব কর্মসূচির মধ্যে ছিল আলোচনা সভা, শহীদ কর্নেল আবু তাহেরের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান এবং অন্যান্য স্মরণমূলক আয়োজন। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও দিবসটি উপলক্ষে দলীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন।
জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান, কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্ব, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে……..
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম