দীর্ঘদিনের কর্মস্থল থেকে বিদায়, অনিশ্চয়তায় ৭৩৯ শ্রমিক
দীর্ঘদিনের কর্মস্থল থেকে আকস্মিক বিদায়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কেয়া গ্রুপের শ্রমিকেরা। কারও কাঁধে সংসারের পুরো দায়িত্ব, আবার কারও জীবনের সেরা সময় কেটেছে কারখানার কাজে। দীর্ঘদিনের কর্মজীবনের পর হঠাৎ চাকরি হারিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের। চাকরি হারানোর শোক ছাপিয়ে তাঁদের সামনে বড় প্রশ্ন—চলবে কীভাবে সংসার, কীভাবে জোগাড় হবে পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের অর্থ?
প্রায় ১৯ বছর ধরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন আবেদা বেগম। জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে কেয়া গ্রুপের কারখানায়। দীর্ঘদিনের কর্মস্থলের সঙ্গে তাঁর গড়ে উঠেছিল জীবনের গভীর সম্পর্ক। কিন্তু হঠাৎ চাকরি হারিয়ে কারখানার ফটকে দাঁড়িয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর এমন বিদায় মেনে নিতে পারছেন না আবেদা বেগম।
আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এত বছর চাকরি করে শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে বিদায় নিতে হচ্ছে।’ দীর্ঘদিন কাজ করার পর আকস্মিকভাবে কর্মস্থল থেকে বিদায় নেওয়ার ঘটনায় তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা ও অনিশ্চয়তা। কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় যে প্রতিষ্ঠানে কাটিয়েছেন, সেখান থেকে চাকরি হারানোর পর এখন কীভাবে সংসার চালাবেন, সেই চিন্তাই তাঁকে ভাবিয়ে তুলছে।
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে ৭৩৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাঁটাইয়ের ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করা এসব কর্মীর হঠাৎ চাকরি হারানোর ঘটনায় তাঁদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং ন্যায্য পাওনা পরিশোধের বিষয়টি সামনে এসেছে।
ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদ শ্রমিক সংগঠনের
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে ৭৩৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশ। সংগঠনটি এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দ্রুত পরিশোধের দাবি জানিয়েছে।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, পাঁচবার লে-অফের পর কেয়া নিট কম্পোজিটের ৭৩৯ শ্রমিককে এক নোটিশে ছাঁটাই করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তাঁরা।
তিনি বলেন, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ অবিলম্বে পরিশোধ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হারানোর বিষয়টি তাঁদের জীবিকা ও পারিবারিক জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের আইনগত অধিকার ও প্রাপ্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
আইন অনুযায়ী পাওনা পরিশোধের আশ্বাস কর্তৃপক্ষের
শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হলেও ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের আইন অনুযায়ী সব পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছে কেয়া গ্রুপ কর্তৃপক্ষ।
প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, শ্রম আইন অনুযায়ী ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের প্রাপ্য পরিশোধ করা হবে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কারখানায় নতুন কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হলে শ্রম আইনের ২১ ধারা অনুসারে ছাঁটাই হওয়া দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অর্থাৎ, পরবর্তী সময়ে কারখানায় কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন দেখা দিলে ছাঁটাই হওয়া দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে বর্তমানে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি বহাল রয়েছে, তাঁরা লে-অফের আওতায় থাকবেন। এ সময় তাঁরা শ্রম আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সুবিধা পাবেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
কারখানার প্রধান ফটকে পুলিশ মোতায়েন
ছাঁটাইয়ের ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কেয়া গ্রুপের প্রধান ফটকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, প্রতিষ্ঠানটির চার কারখানায় ৭৩৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেখানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে শ্রমিকেরা
দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হারিয়ে এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন কেয়া গ্রুপের ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকেরা। তাঁদের অনেকের কাছে এই চাকরি ছিল পরিবারের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন। হঠাৎ কর্মসংস্থান হারানোর পর সংসারের খরচ, পরিবারের ভরণপোষণ এবং নতুন কাজের সন্ধান নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
প্রায় ১৯ বছর ধরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করা আবেদা বেগমের মতো অনেক শ্রমিকের কাছেই দীর্ঘদিনের কর্মস্থল শুধু আয়ের উৎস নয়, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। সেই কর্মস্থল থেকে আকস্মিক বিদায়ের পর তাঁদের কাছে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে আইন অনুযায়ী ন্যায্য পাওনা বুঝে পাওয়া এবং নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
দীর্ঘদিনের শ্রম ও কর্মজীবনের পর চাকরি হারানো এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সামনে এখন নতুন করে জীবিকা নির্বাহের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে কর্তৃপক্ষের আইন অনুযায়ী পাওনা পরিশোধের আশ্বাস, অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনের দ্রুত বকেয়া ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি—সব মিলিয়ে কেয়া গ্রুপের ছাঁটাইয়ের ঘটনায় শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে……..
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম