ফ্রান্সের বিক্ষোভ নিয়ে ট্রাম্পসহ বিদেশি নেতাদের মন্তব্য ‘বোকামি’: ম্যাক্রোঁ
আন্তর্জাতিক সংবাদ | বিশ্ব রাজনীতি
রাজনৈতিক স্বার্থে ফ্রান্সের পরিস্থিতি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়ানোর অভিযোগ; এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ছড়ানোর বিষয়েও সতর্ক করলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
তারিখ: ২২ অক্টোবর ২০২৬
সময়: সকাল ১০টা ৪১ মিনিট (বাংলাদেশ সময়)
প্রতিবেদন: আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রতিষ্ঠান: জেটিভি নিউজ বাংলা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ ও সহিংসতা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিদেশি নেতাদের মন্তব্যকে ‘বোকামি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। রাজনৈতিক স্বার্থে ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে এসব নেতা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।
কাতার সফরকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ম্যাক্রোঁ বলেন, গত শনিবার ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গার পর পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহল তথ্যের ‘অপব্যবহার’ করেছে। এ সময় এমন কিছু মন্তব্য করা হয়েছে, যেগুলো তাঁর ভাষায় একই সঙ্গে অগ্রহণযোগ্য ও বোকামিপূর্ণ। এসব মন্তব্যকারীর মধ্যে বিদেশি নেতারাও রয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্পকেও ইঙ্গিত করেছেন ম্যাক্রোঁ
ম্যাক্রোঁর এই মন্তব্যের পর তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করছেন? জবাবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘অন্যদের পাশাপাশি তাকেও।’
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে প্রচার চালানোর সময় ট্রাম্প ফ্রান্সের সহিংসতার জন্য ‘অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টদের’ দায়ী করেন। তাঁর এই বক্তব্যের পর ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি নেতাদের মন্তব্যের বিষয়ে ম্যাক্রোঁর আপত্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দোহার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ম্যাক্রোঁ বলেন, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল কিংবা আটলান্টিকের ওপারে—নির্বাচনি প্রচারে যুক্ত কিছু নেতা সরলভাবে এমন সব বক্তব্য ও বয়ান ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যা কিছু মহল স্পষ্টতই প্রচার করতে চাইছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, এসব বক্তব্যের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে নির্বাচনি প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন।
ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘তারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারের জন্য আমাদের দেশকে ব্যবহার করছেন। আমাদের এর প্রয়োজন নেই। আমাদের এমনিতেই সামলানোর মতো অনেক সমস্যা রয়েছে।’
এআই দিয়ে তৈরি ছবি ছড়ানোর অভিযোগ
ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবির সত্যতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ম্যাক্রোঁ। তাঁর দাবি, দেশটিতে এমন কিছু ছবি ছড়ানো হচ্ছে, যেগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। অথচ ছবিগুলোতে দেখানো ঘটনাগুলো বাস্তবে ফ্রান্সে ঘটেনি।
ম্যাক্রোঁ বলেন, এসব ছবি ও বক্তব্যের মাধ্যমে ফ্রান্সের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, ‘কেউ কেউ দাবি করেছেন, অভিবাসী ও ইসলামপন্থিদের বিশাল ঢল আমাদের দেশে আছড়ে পড়েছে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিবাসী ও ইসলামপন্থিদের ব্যাপক আগমনের যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ধরনের দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রচার করা হচ্ছে বলেও তাঁর অভিযোগ।
নেতানিয়াহুর মন্তব্য ঘিরেও বিতর্ক
ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। আগামী সপ্তাহান্তে নির্বাচন সামনে রেখে তিনি ফ্রান্সে ‘চরমপন্থি ইসলামের আগ্রাসন’ ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন।
তবে ফ্রান্সের বিক্ষোভের প্রধান কারণ হিসেবে অভিবাসীদের দায়ী করার দাবিকে বিশ্লেষকেরা নাকচ করেছেন। অর্থাৎ, দেশটিতে চলমান অস্থিরতার জন্য অভিবাসীদেরই প্রধানত দায়ী করার যে বক্তব্য বিভিন্ন মহল থেকে সামনে এসেছে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আপত্তি রয়েছে।
বিদেশি নেতাদের এসব মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে অভিবাসন, ইসলামপন্থি রাজনীতি এবং জননিরাপত্তার বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের নেতাদের বক্তব্য আলোচনায় এসেছে।
ম্যাক্রোঁ ও তাঁর সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
প্রেসিডেন্টের উত্তরসূরি নির্বাচনের ছয় মাস আগে ফ্রান্সে এই সংকটের মুখে পড়েছেন ম্যাক্রোঁ ও তাঁর সরকার। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গত শনিবারের দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল’ বলেও স্বীকার করা হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক সহিংসতা ও লুটপাটে রূপ নেয়। একপর্যায়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাজধানী প্যারিসসহ মার্সেই, লিওঁ ও লিমোজ শহরে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
লিমোজে টাউন হলে আগুন, ভবনের একাংশ ধ্বংস
সহিংসতার সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি ঘটে লিমোজ শহরে। সেখানে টাউন হল ভবনে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে ভবনটির একাংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
এই ঘটনা ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতার ব্যাপকতা এবং সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন কীভাবে সহিংসতা ও লুটপাটে রূপ নিয়েছে, তা নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা চলছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রভাব
ফ্রান্সের চলমান সংকট এখন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিতর্কেরও অংশ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প, নেতানিয়াহু এবং অন্যান্য বিদেশি নেতার মন্তব্যের জবাবে ম্যাক্রোঁ স্পষ্ট করেছেন, ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থে বিভ্রান্তিকর বয়ান ছড়ানো তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেন না।
একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের চাপ, অন্যদিকে অভিবাসন ও ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিতর্ক—সব মিলিয়ে ম্যাক্রোঁর সরকারকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
ছবি ঃ এপি
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে…….
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম