ইয়াবা-কোকেন থেকে অনলাইন প্রতারণা: চট্টগ্রাম বিভাগের ৮ কারাগারে ১৯৮ বিদেশি
চট্টগ্রাম ব্যুরো:
ইয়াবা ও কোকেনের মতো মাদক পাচার থেকে শুরু করে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম বিভাগের আটটি কারাগারে ১৯৮ জন বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি ৩০ জন। আর ১৬৮ জন হাজতি হিসেবে কারাগারে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম চলমান।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারের মধ্যে আটটিতে বিভিন্ন দেশের নাগরিক বন্দি রয়েছেন। বন্দিদের মধ্যে মিয়ানমার, চীন, নাইজেরিয়া, লাওস ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। তাদের কারও বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত মামলা রয়েছে, আবার কেউ অনলাইনভিত্তিক প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে বিচারাধীন।
সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে ঘিরে মাদক পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি নাগরিকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার একাধিক ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে কারাগারে থাকা বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা ও তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
খুলশীতে ৬৩ বিদেশি গ্রেপ্তার
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি নাগরিকদের জড়িত থাকার অভিযোগে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে চট্টগ্রাম নগরের খুলশী এলাকায়।
গত ১০ সেপ্টেম্বর খুলশী থানা এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের ৬৩ নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি সংঘবদ্ধ অনলাইন প্রতারণা চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, নগরের একটি ভবন ভাড়া নিয়ে সেখানে বিদেশি নাগরিকদের বিভিন্ন কক্ষে রাখা হয়েছিল। ওই ভবন থেকেই অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার তথ্য পাওয়া যায়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরির প্রলোভন দেখানো, অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং অন্যান্য প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্তাধীন এবং মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
কক্সবাজারেও অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ
চট্টগ্রামের পাশাপাশি কক্সবাজারেও বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগে অভিযান চালানোর ঘটনা ঘটেছে।
এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার শহরের একটি হোটেলে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগে ছয় বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন চীনের এবং একজন তাইওয়ানের নাগরিক।
পুলিশের অভিযানে তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ এবং যোগাযোগের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
এই বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও যোগাযোগের সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় বিদেশি নাগরিকদের কথিত অনলাইন কর্মকাণ্ড নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে তদন্ত শুরু হয়।
ইউপিএসের ভেতর ৩ কেজি ৯০০ গ্রাম কোকেন
বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগের মধ্যে শুধু অনলাইন প্রতারণাই নয়, মাদক পাচারের ঘটনাও রয়েছে।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক গোয়েন্দা, নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও পুলিশের যৌথ অভিযানে বাহামা দ্বীপপুঞ্জের গ্র্যান্ড বাহামা দ্বীপের নাগরিক স্ট্যাশিয়া শ্যান্টিয়া রোলকে আটক করা হয়।
৫৩ বছর বয়সী ওই নারীর কাছে থাকা একটি কম্পিউটার ইউপিএসের ভেতর থেকে ৩ কেজি ৯০০ গ্রাম কোকেন উদ্ধার করা হয়।
অভিযানের পর এ ঘটনায় পতেঙ্গা থানায় মামলা করা হয়। পরে আদালতে স্ট্যাশিয়া শ্যান্টিয়া রোল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
ঘটনার তদন্তের ধারাবাহিকতায় কোকেনের ওই চালান তদারকিতে জড়িত থাকার অভিযোগে একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর দুই নাইজেরিয়ান নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
তারা হলেন আফিজ ওয়াহাব ও ইকোচুকু এনওয়াগড।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ওই দুই নাইজেরিয়ান নাগরিক ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন এবং দেশের বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলতেন। পুলিশের অভিযোগ, ফুটবল খেলার আড়ালে তারা মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
আট কারাগারে ১৯৮ বিদেশি
চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ১২টি কারাগারের মধ্যে আটটিতে বর্তমানে মোট ১৯৮ জন বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন।
এর মধ্যে ১৬৮ জন হাজতি। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিচার এখনো চলমান। আর ৩০ জন কয়েদি, অর্থাৎ বিভিন্ন মামলায় তাদের সাজা হয়েছে।
কারাগারভিত্তিক হিসাবে বিদেশি বন্দিদের সংখ্যা হলো—
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার:
এখানে মোট ৮৩ জন বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৩ জন কয়েদি এবং বাকি ৭০ জন হাজতি।
কুমিল্লা কারাগার:
বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন ২ জন।
কক্সবাজার কারাগার:
বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন ৬১ জন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগার:
বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন ১ জন।
নোয়াখালী কারাগার:
বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন ১ জন।
ফেনী-১ কারাগার:
বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন ৩ জন।
রাঙামাটি কারাগার:
বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন ২ জন।
বান্দরবান কারাগার:
বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন ৪৫ জন।
সব মিলিয়ে এই আট কারাগারে বিদেশি বন্দির সংখ্যা ১৯৮ জন।
মাদক মামলায় মিয়ানমারের নাগরিক বেশি
কারা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধে মামলা রয়েছে।
বিশেষ করে মিয়ানমারের নাগরিকদের বড় একটি অংশ মাদক মামলার আসামি বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক মো. ছগির মিয়া বলেন, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে অনেক বিদেশি বন্দি বিভাগের কারাগারগুলোতে রয়েছেন।
তিনি বলেন, মিয়ানমার, চীন, নাইজেরিয়া, লাওস, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক কারাগারে বন্দি রয়েছেন। মিয়ানমারের বন্দিদের মধ্যে বেশিরভাগই মাদক মামলার আসামি।
অপরাধের ধরন নিয়ে নতুন আলোচনা
চট্টগ্রাম বিভাগের কারাগারে বন্দি বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে কেউ মাদক মামলায়, আবার কেউ অনলাইনভিত্তিক প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিচারাধীন রয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম নগর ও কক্সবাজারে বিদেশি নাগরিকদের জড়িত থাকার অভিযোগে একাধিক অভিযান, বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডিজিটাল সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে।
এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশি নাগরিকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ কোকেন উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার পর সীমান্তবর্তী চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে বিদেশি নাগরিকদের মাধ্যমে সংঘটিত বা তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা অপরাধের ধরন ও বিস্তৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে কারাগারে থাকা বিদেশি নাগরিকদের সবাই যে একই ধরনের অপরাধে জড়িত—এমন কোনো তথ্য কারা কর্তৃপক্ষ দেয়নি। তাদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও মামলাগুলো পৃথকভাবে বিচারাধীন বা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
জেটিভি নিউজ বাংলা
.সত্য, সাহস,সংযোগ… ….
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম