কবরস্থানের ৩.৩২ একর জমি দখল করে চা-বাগান, জেলা প্রশাসকের কাছে স্থানীয়দের অভিযোগ
পঞ্চগড় প্রতিনিধি:
ছবি সংগৃহীত
পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের ঠুটাপাখুরী গ্রামের প্রায় দুই হাজার মানুষের ব্যবহৃত কবরস্থানের জায়গা দখল করে চা-বাগান করার অভিযোগ উঠেছে একই এলাকার আব্দুল আজিজ ও তাঁর ছেলে আমিনার রহমানের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় আমিনার রহমান কর্তৃক চা-পাতা রোপণ করা ৩ দশমিক ৩২ একর কবরস্থানের জমি উদ্ধারের দাবি জানিয়ে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ঠুটাপাখুরী গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দারা।
অভিযোগে যা বলা হয়েছে
স্থানীয় বাসিন্দাদের দায়ের করা লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের ঠুটাপাখুরী গ্রামের এসএ খতিয়ান নম্বর ২৯৯-এর দাগ নম্বর ৪৪১৭-তে ২ দশমিক ৯৭ একর এবং দাগ নম্বর ৪৪১৮-তে ৩৫ শতক জমি রয়েছে। দুই দাগে জমির মোট পরিমাণ ৩ দশমিক ৩২ একর।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই ৩ দশমিক ৩২ একর জমির ওপর দীর্ঘদিন ধরে কবরস্থান হিসেবে মৃত ব্যক্তিদের দাফন করে আসছিলেন স্থানীয়রা। শুধু ঠুটাপাখুরী গ্রামের বাসিন্দারাই নন, পার্শ্ববর্তী আরও ২ থেকে ৩টি গ্রামের মৃত ব্যক্তিদেরও ওই কবরস্থানে দাফন করা হতো।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এসএ খতিয়ান নম্বর ২৯৯-এর দাগ নম্বর ৪৪১৭ ও ৪৪১৮-এর জমির ধরনে ‘কবরস্থান’ এবং ‘মুসলমান সাধারণের ব্যবহার্য’ কথাগুলো উল্লেখ রয়েছে।
ট্রাক্টর দিয়ে কবর মিশিয়ে চা-বাগান করার অভিযোগ
ঠুটাপাখুরী গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের আমলে আব্দুল আজিজের ছেলে আমিনার রহমান কবরস্থানের ওই ৩ দশমিক ৩২ একর জমিতে ট্রাক্টর চালিয়ে কয়েক শ কবর মিশিয়ে দেন। পরে সেখানে চা-গাছ রোপণ করে চা-বাগান তৈরি করেন বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এটি ছিল বড় আকারের একটি কবরস্থান। সেখানে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষও তাদের স্বজনদের দাফন করতেন। কিন্তু কবরস্থানের জায়গাটি দখল হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে স্থানীয়দের মৃত ব্যক্তিদের দাফনের জন্য চাষের জমি কিংবা বসতবাড়ির পাশের জায়গার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এতে এলাকায় ভবিষ্যতে মৃত ব্যক্তিদের দাফনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিয়ে সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
জরিপ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভূমি জরিপের সময়ে ভূমি জরিপ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কবরস্থানের জমি আমিনার রহমান নিজের নামে করে নিয়েছেন।
তবে স্থানীয়দের এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি নথিতে জমির ধরন কবরস্থান এবং মুসলমান সাধারণের ব্যবহার্য হিসেবে উল্লেখ থাকার পরও কীভাবে ওই জমি ব্যক্তির নামে রেকর্ডভুক্ত হলো, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসকের কাছে স্থানীয়দের দাবি
লিখিত অভিযোগে ঠুটাপাখুরী গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দারা বিষয়টি সরেজমিনে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে বেদখল হয়ে যাওয়া ৩ দশমিক ৩২ একর কবরস্থানের জমি উদ্ধার, কবরস্থানের জায়গা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া এবং জমি দখলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কবরস্থানটি শুধু একটি গ্রামের নয়; দীর্ঘদিন ধরে আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রামের মানুষও এটি ব্যবহার করে আসছিলেন। ফলে জায়গাটি পুনরুদ্ধার করা না হলে ভবিষ্যতে কয়েকটি গ্রামের মানুষের দাফন কার্যক্রমে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
অভিযুক্তের বক্তব্য
এদিকে কবরস্থানের জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত আমিনার রহমান।
এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে কবরস্থানের জায়গা দখলের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।
আমিনার রহমানের দাবি, উক্ত জমি তাঁরা সিএস রেকর্ড থেকে পৈতৃক সূত্রে পেয়েছেন। তাঁর বাবার নামে ওই জমির তিনটি—সিএস, এসএ ও আরএস—রেকর্ড রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমি উক্ত জমিতে ২০০৮ সালের পূর্বে চা-বাগান রোপণ করি। তারা আমার বিরুদ্ধে কবরস্থানের জায়গা দখলের অভিযোগ আনয়ন করছে। অভিযোগ যে কেউ আনয়ন করতে পারে, কিন্তু তা অবশ্যই কাগজে-কলমে প্রমাণিত হতে হবে।”
অভিযুক্তের বক্তব্য অনুযায়ী, জমিটির মালিকানা নিয়ে তাঁর পরিবারের পক্ষে পুরোনো রেকর্ড রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট এসএ খতিয়ান ও দাগের জমির ধরনেই কবরস্থান এবং মুসলমান সাধারণের ব্যবহার্য হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
ফলে ৩ দশমিক ৩২ একর জমিটির প্রকৃত মালিকানা, রেকর্ডের ধারাবাহিকতা, জমির শ্রেণি এবং কবরস্থান হিসেবে এর ব্যবহার—এসব বিষয় ভূমি রেকর্ড ও সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
এ বিষয়ে প্রশাসনের তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড পর্যালোচনার পরই কবরস্থানের জমি দখলের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য,সাহস, সংযোগ……
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম