৬৬৬ কোটি টাকার কর নিয়ে চাপে ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণ, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল
গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা করের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল, এনবিআরের দাবির মুখে ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠান
ঢাকা: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণ। রোববার (১৮ অক্টোবর) আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এ আপিল আবেদন দাখিল করা হয়।
এনবিআরের দাবি করা বিপুল অঙ্কের কর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা আইনি বিরোধে হাইকোর্টের রায় গ্রামীণ কল্যাণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ওই অর্থ আদায়ের পথ খুলেছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষের। তবে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করায় এখন বিষয়টি আপিল বিভাগের বিবেচনাধীন হওয়ার পথে রয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণকে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে। এ-সংক্রান্ত রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেন বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।
আদালতে ড. ইউনূসের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন ও ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল। হাইকোর্টের রায়ের পর সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের বিচারপতিদের স্বাক্ষর শেষে গত ১২ অক্টোবর রায়ের ১৫ ও ৩২ পৃষ্ঠার দুটি পৃথক পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
পাঁচ করবর্ষের কর দাবি নিয়ে বিরোধ
গ্রামীণ কল্যাণের বিরুদ্ধে এনবিআরের ৬৬৬ কোটি টাকার কর দাবি মূলত পাঁচটি করবর্ষকে কেন্দ্র করে। করবর্ষগুলো হলো ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭।
পুনর্মূল্যায়নের পর এসব করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে প্রদেয় আয়কর নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। এ বিষয়ে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি পৃথক দুটি রিট আবেদন করে। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেন। পরবর্তী সময়ে ওই রুলের ওপর শুনানি শেষে তা খারিজ করে দেন হাইকোর্টের নতুন বেঞ্চ।
রিট খারিজের ফলে এনবিআরের কর দাবির বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের আইনি চ্যালেঞ্জ হাইকোর্টে সফল হয়নি। আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে এনবিআর প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে আয়কর বাবদ দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আদায় করতে পারবে। তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আপিল করা হয়েছে বলে কর আদায়ের বিরোধটি উচ্চতর আদালতে গড়াচ্ছে।
২০২৪ সালে আগের রায় প্রত্যাহার করেছিল হাইকোর্ট
এই মামলার আইনি প্রক্রিয়ায় এর আগে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ওই দিন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের বিষয়ে দেওয়া আগের রায় স্বপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করে নেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় প্রত্যাহার করেন। একই সঙ্গে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। পরে মামলাটি শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চে পাঠানো হয়।
নতুন বেঞ্চে মামলাটি পুনরায় বিবেচনার পর ১০ সেপ্টেম্বর রিটের রুল খারিজ করে রায় দেওয়া হয়। অর্থাৎ, আগের রায় প্রত্যাহারের পর নতুন করে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আবারও গ্রামীণ কল্যাণের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত আসে। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই এবার আপিল করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠানের কর বিরোধে নতুন করে আলোচনা
ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন অর্থনীতিবিদ ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেছেন। তাঁর মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের বিরুদ্ধে এনবিআরের ৬৬৬ কোটি টাকার কর দাবি এবং এ নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধ তাঁর প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কর-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে জনআলোচনায় এনেছে।
একদিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে থাকা এনবিআর বিপুল অঙ্কের কর দাবি করেছে, অন্যদিকে ওই দাবি চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠানটি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। ২০১৭ সালে পৃথক দুটি রিট দায়ের থেকে শুরু করে আগের রায় প্রত্যাহার, নতুন বেঞ্চে পুনরায় শুনানি এবং সর্বশেষ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল—সব মিলিয়ে বিরোধটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।
হাইকোর্টের সর্বশেষ রায়ে এনবিআরের দাবির পক্ষে অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় গ্রামীণ কল্যাণের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। তবে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত মামলার চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
এখন আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
রোববার গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষ থেকে আপিল আবেদন দাখিলের মধ্য দিয়ে ৬৬৬ কোটি টাকার কর নিয়ে বিরোধটি উচ্চতর আদালতে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আপিল বিভাগে আবেদনটির শুনানি ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের আপত্তির বিষয়ে বিচারিক মূল্যায়ন হবে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের বিষয়ে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকবে, নাকি আপিল বিভাগ ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেবেন। সেই সিদ্ধান্তের ওপরই মামলার পরবর্তী আইনি অগ্রগতি নির্ভর করবে।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে……..
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম