বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দামে বড় উল্লম্ফন, ২০২৭ সালেও বাড়বে মূল্যবৃদ্ধির চাপ
২০২৬ সালে পণ্যের দাম গড়ে ২৩ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের, আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাড়ছে উদ্বেগ
জেটিভি নিউজ বাংলা ডেস্ক:
বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি বছরের শেষ দুই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। শুধু তাই নয়, আগামী বছরজুড়েও মূল্যবৃদ্ধির চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। বাড়তে পারে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়।
বিশ্বব্যাংকের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম গড়ে ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে প্রধান তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। এগুলো হলো—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বেড়ে যাওয়া, শস্য পরিবহনে বিঘ্ন এবং শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট আবহাওয়াগত ঝুঁকি।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে বাড়তে পারে আরও ৭ শতাংশ। অর্থাৎ দুই বছরে সব মিলিয়ে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৮ শতাংশে।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, জ্বালানি, খাদ্য ও আবহাওয়াজনিত এসব সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতির দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে।
তবে বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিংবা অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের দাম কতটা বাড়তে পারে, সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংক নির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস দেয়নি।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাজারে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং আমদানিকারকদের বাড়তি ব্যয়ের কতটা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে, তার ওপর।
দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে।
অথচ ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এ অঞ্চলে খাদ্য মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদি গড়কেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, শস্য ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার পূর্বাভাস এ অঞ্চলের মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষ করে চালের বাজারে ইতোমধ্যে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছর আগের তুলনায় চালের দাম ২৪ শতাংশ বেশি ছিল।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এল নিনো-সংশ্লিষ্ট আবহাওয়াগত উদ্বেগের কারণে চালের বাজারে এই চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে চালের দাম আরও ১০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১২ শতাংশ বাড়তে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গত এক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম বিশ্বে চালের উৎপাদন কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো চালনির্ভর খাদ্যাভ্যাসের দেশে আন্তর্জাতিক চালের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের সরবরাহ কমে গেলে আমদানি ব্যয় ও বাজার ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
গমের দাম দুই বছরে বাড়তে পারে ৪২ শতাংশ
গম চাতালে শুকাচ্ছেেন
চালের পাশাপাশি গমের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে গমের দাম ২৮ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে আরও ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে।
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শস্যের দাম বেড়েছে ৯ শতাংশ। এক বছর আগের তুলনায় শস্যের দাম এখন ২৫ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে গমের দাম বেড়েছে ১৩ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বর্তমানে গমের দাম ৪০ শতাংশ বেশি।
এদিকে, অক্টোবরে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্যসূচক এক বছর আগের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি ছিল।
চাল ও গমের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যের দাম বাড়লে খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীল রাখাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস, ব্রেন্ট তেল ৯১ ডলার
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সূচক
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয়টি প্রতিবেদনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। এর মধ্য দিয়ে টানা তিন বছর জ্বালানির দাম কমার প্রবণতার অবসান ঘটবে।
এ বছর প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম ৯১ ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৫ সালে এই দাম ছিল ৬৯ ডলার।
তবে ২০২৭ সালের এক পর্যায়ে তেলের দাম কমে প্রতি ব্যারেল ৭৯ ডলারে নামতে পারে বলেও পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি বিশ্বে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে।
২০২০ সালের করোনা মহামারির সময়টুকু বাদ দিলে চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে তেলের সরবরাহ কমার এটিই হবে সবচেয়ে বড় ঘটনা।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে তিন গুণ হয়েছে এশিয়ায় এলএনজির দাম
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব পড়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির বাজারেও।
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ায় অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে এশিয়ার এলএনজির দাম সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণে পৌঁছেছিল।
এ পরিস্থিতি এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়তে পারে।
ইউরিয়ার দাম বাড়ছে, কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির শঙ্কা
জ্বালানির পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ইউরিয়ার বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে ইউরিয়ার দাম বেড়েছে। বছরের শেষ দিকে তা আরও ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে ২০২৭ সালে ইউরিয়ার দাম ১২ শতাংশ কমার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। বিশেষ করে সার উৎপাদন, কৃষি জমিতে সেচ, ফসল সংগ্রহ এবং বাজারজাতকরণের ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে।
আমদানি করা জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধাতুর দাম ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে, রেকর্ড উচ্চতায় অ্যালুমিনিয়াম-তামা-টিন
খাদ্য ও জ্বালানির পাশাপাশি বিশ্ববাজারে ধাতুর দামও নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সামগ্রিকভাবে ধাতুর দাম ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
ইতোমধ্যে অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগ বাড়ার কারণে এসব ধাতুর চাহিদা বেড়েছে।
বিশেষ করে বিদ্যুৎ অবকাঠামো, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে ধাতুর ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা আরও জোরালো হয়েছে।
এর পাশাপাশি চলতি বছরের সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নও ধাতুর দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
তবে ২০২৭ সালে ধাতুর দাম সামগ্রিকভাবে ৩ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
মূল্যবান ধাতুর দাম বাড়তে পারে ৪০ শতাংশ
নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে মূল্যবান ধাতুর চাহিদাও বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূরাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৬ সালে মূল্যবান ধাতুর দাম ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে।
২০২৭ সালে এসব ধাতুর দাম কিছুটা কমলেও ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের গড় দামের তুলনায় তা তিন গুণের বেশি থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে মূল্যবান ধাতুর বাজারেও উচ্চমূল্যের প্রবণতা বজায় থাকতে পারে।
এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশের চা উৎপাদন ও গুণগত মান কমার আশঙ্কা
চা তুলছেন চা শ্রমিকেরা
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো বাংলাদেশের চা উৎপাদন নিয়ে সতর্কতা।
চা উৎপাদনের ওপর আবহাওয়ার প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রতিবেদনে সরাসরি বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় চায়ের উৎপাদন ও গুণগত মান কমতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অঞ্চলে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে, দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশই এল নিনোর প্রভাবে উচ্চ বা মাঝারি মাত্রায় ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে চায়ের বৈশ্বিক বাজারে আপাতত সরবরাহের ঘাটতি নেই। উত্তর ভারত ও বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে পর্যাপ্ত চা রয়েছে।
তবে বাংলাদেশে চা উৎপাদন ঠিক কতটা কমতে পারে, সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ বা শতাংশ উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে, আবহাওয়াজনিত কারণে উৎপাদন কমার আশঙ্কা থাকলেও দুর্বল চাহিদার প্রভাবে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কলম্বো ও কলকাতার নিলামে চায়ের দাম ১ শতাংশ কমেছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে চায়ের দাম ৪ শতাংশ এবং ২০২৮ সালে আরও ২ শতাংশ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চায়ের চাহিদা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
২০২৭ সালে পণ্যের দাম ৭ শতাংশ কমতে পারে, তবে রয়েছে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা
বিশ্ববাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৭ সালে পণ্যের দাম সামগ্রিকভাবে ৭ শতাংশ কমতে পারে।
তবে এই পূর্বাভাস নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার ওপর। ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং আবহাওয়াজনিত বড় ধরনের ধাক্কা দেখা দিলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংক তিনটি বড় ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে।
প্রথমত, জ্বালানির উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকা।
দ্বিতীয়ত, কৃষ্ণসাগরে শস্যবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়া।
তৃতীয়ত, অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব তৈরি হওয়া।
এই তিনটি সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে ২০২৭ সালে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
শুধু জ্বালানিই নয়, খাদ্যপণ্যের দামও পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক পূর্বাভাসের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে। শস্যের দাম বাড়তে পারে ২০ শতাংশ।
এমনকি খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।
আরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়তে পারে
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্বের আরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়বে।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে খাদ্য ও জ্বালানির ব্যয় বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
এতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য কেনার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতাও বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক গ্রুপ বিভিন্ন ধরনের সহায়তার প্রস্তুতি রেখেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সহায়তা, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও খামারগুলোর চলতি মূলধনের জোগান নিশ্চিত করতে বিদ্যমান বিভিন্ন ব্যবস্থার আওতায় ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ।
এর মধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলার আগাম অর্থায়ন হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে।
অর্থাৎ সংকট আরও গভীর হলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও জনগোষ্ঠীকে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখছে সংস্থাটি।
একসঙ্গে বেশ কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পণ্যের বাজার: আয়হান কোসে
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ ও প্রসপেক্টস গ্রুপের পরিচালক আয়হান কোসে বলেছেন, একসঙ্গে বেশ কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে পণ্যের বাজার।
তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে বেশ কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে পণ্যের বাজার। জ্বালানির বাড়তি খরচ ও বাণিজ্যিক বাধার কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের ভারে আগে থেকেই চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে
বিশ্বব্যাংকের এই পূর্বাভাস বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কারণ, বাংলাদেশ খাদ্যশস্য, জ্বালানি, সার ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় এবং আমদানিকারকদের বাড়তি খরচ যুক্ত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
বিশেষ করে চাল ও গমের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হলে খাদ্য আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। ভোজ্যতেলের দাম বাড়লে সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও এলএনজির দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং পরিবহন খাতে খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব পরবর্তী সময়ে খাদ্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে।
এ ছাড়া এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশের চা উৎপাদন ও গুণগত মান কমে গেলে দেশের চা শিল্প নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
তবে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য মূল্যস্ফীতি বা বাজারে পণ্যের দাম কত শতাংশ বাড়তে পারে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেয়নি।
বাংলাদেশে প্রকৃত প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার এবং বাড়তি ব্যয়ের কতটা ভোক্তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে, তার ওপর।
সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে খাদ্য, জ্বালানি, সার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আগামী বছর আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে……..
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম