১১ বছর পর নতুন বেতনকাঠামোয় বেতন পেলেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, পে ফিক্সেশনে আটকে প্রায় ১ লাখের বেতন
নিজস্ব প্রতিবেদক,ছবি এআই জেনারেট
দীর্ঘ ১১ বছর অপেক্ষার পর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী বর্ধিত বেতন পাওয়া শুরু করেছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন জমা হতে শুরু করে। অক্টোবর মাসের নিয়মিত বেতনের পাশাপাশি গত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বর্ধিত বেতনের বকেয়া অর্থও পেয়েছেন অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী। তবে নতুন বেতন নির্ধারণ বা ‘পে ফিক্সেশন’ প্রক্রিয়ায় জটিলতা থাকায় প্রায় এক লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনও বেতন পাননি।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর আওতায় প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, আট লাখ পেনশনভোগী এবং ছয় লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক বর্ধিত আর্থিক সুবিধা পাওয়ার কথা। এরই মধ্যে অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকের ব্যাংক হিসাবে নতুন কাঠামো অনুযায়ী অর্থ জমা হয়েছে। তবে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনও সম্পন্ন হয়নি, তাদের বেতন আটকে রয়েছে।
সকাল ১০টার পর থেকে বেতন জমার বার্তা
কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী জানিয়েছেন, রবিবার সকাল ১০টার পর থেকে তাদের মোবাইল ফোনে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বেতন জমা হওয়ার বার্তা আসতে শুরু করে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী অক্টোবর মাসের বেতনের পাশাপাশি আগের তিন মাসের বর্ধিত বেতনের বকেয়া অর্থও তাদের হিসাবে জমা হয়েছে।
তবে যাদের পে ফিক্সেশন বা বেতন নির্ধারণের কাজ এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তারা বেতন পাওয়া থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের আশা, বেতন নির্ধারণের জটিলতা কাটিয়ে আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীও তাদের বেতন পেতে পারেন। ফলে নতুন কাঠামো অনুযায়ী অধিকাংশের বেতন পরিশোধ শুরু হলেও এখনও প্রায় এক লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে অসংগতি ও বৈষম্যের অভিযোগ
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের শুরুতেই বিভিন্ন পর্যায়ে বেশ কিছু অসংগতি ও জটিলতার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে জ্যেষ্ঠতা, গ্রেড নির্ধারণ এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব অসংগতি দূর করার দাবিতে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মচারীরা। আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা ও গ্রেডের ধারাবাহিকতা ঠিক রাখা হয়নি। ফলে একই ধরনের চাকরিগত অবস্থান বা পদমর্যাদার ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণে অসংগতি তৈরি হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
এ ছাড়া বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নতুন কাঠামোতে বেতন নির্ধারণের পর প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগ করছেন কেউ কেউ। আবার পদোন্নতি পাওয়ার পরও কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর মোট আয় আগের তুলনায় কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এসব কারণে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকরের শুরুতেই বিভিন্ন দপ্তরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব অসংগতি দূর করার বিষয়ে কাজ চলছে। বেতন নির্ধারণ, গ্রেডের ধারাবাহিকতা এবং ভাতাসংক্রান্ত সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত সব সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান হয়নি।
১৭ সেপ্টেম্বর জারি হয় নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন
গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী, প্রথম থেকে একাদশ গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে দ্বাদশ থেকে বিংশ গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত।
সরকার গত ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হিসেবে গণ্য করলেও শুরুতেই এর শতভাগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। বরং সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়েকটি ধাপে বর্ধিত মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একসঙ্গে পুরো বর্ধিত বেতন পাচ্ছেন না।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন হবে নতুন বেতনকাঠামো
ছবি ঃ এআই জেনারেট
প্রজ্ঞাপনে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য ধাপে ধাপে সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত অর্থ পাবেন। অন্যদিকে দশম থেকে বিংশ গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত অর্থ পাবেন। এই অর্থ গত ৩০ জুন পর্যন্ত তাদের প্রাপ্য মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে।
দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নতুন কাঠামোর বর্ধিত মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ কার্যকর করা হবে। অর্থাৎ এ সময় থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রথম ধাপের তুলনায় আরও বেশি বর্ধিত মূল বেতনের সুবিধা পাবেন।
তৃতীয় ও শেষ ধাপে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর শতভাগ সুবিধা কার্যকর করার কথা রয়েছে। এ সময় থেকে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিসহ নতুন কাঠামো অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ বেতন সুবিধা পাওয়ার কথা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
অন্যান্য ভাতার নতুন হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে
নতুন বেতনকাঠামোয় মূল বেতন বাড়ানো হলেও অন্যান্য ভাতার ক্ষেত্রে নতুন হার এখনই কার্যকর হচ্ছে না। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২০২৬ সালের ৩০ জুনে প্রচলিত হার অনুযায়ী অন্যান্য ভাতা পাবেন।
অর্থাৎ নতুন মূল বেতন কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া চললেও বাড়িভাড়া, চিকিৎসাসহ অন্যান্য ভাতার সংশোধিত হার নির্ধারিত সময়ের আগে কার্যকর হচ্ছে না। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এসব সংশোধিত ভাতার হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
এ কারণে মূল বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাওয়া শুরু হলেও অন্যান্য ভাতার ক্ষেত্রে নতুন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পেতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
সর্বশেষ বেতনকাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে
এর আগে সর্বশেষ ২০১৫ সালে জাতীয় বেতনকাঠামো কার্যকর হয়েছিল। ওই সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন ৯৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন গ্রেডে ১০১ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
এরপর দীর্ঘ সময় নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো কার্যকর হয়নি। অবশেষে ১১ বছর পর নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবারের কাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন বেতন নিয়ে স্বস্তি, তবে জটিলতা কাটেনি
নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন জমা শুরু হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের বর্ধিত বেতনের বকেয়া অর্থ একসঙ্গে পাওয়ায় অনেকেই আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন।
তবে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন না হওয়ায় প্রায় এক লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন আটকে থাকা, জ্যেষ্ঠতা ও গ্রেড নির্ধারণে অসংগতি এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়ে অভিযোগ নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে ১১ বছর পর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর সুবিধা পাওয়া শুরু হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন অসংগতি নিরসন এখনও বাকি। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, দ্রুত পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করে বেতন আটকে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অর্থ পরিশোধ এবং গ্রেড, জ্যেষ্ঠতা ও ভাতাসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা হবে।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে…...
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম