সৌরবিদ্যুতে বড় স্বপ্ন, পথে জমির সংকট
২০৩০ সালে ২৪–২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা; ছাদভিত্তিক ও ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে ১০ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য
বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে দ্রুত। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে জোর দিচ্ছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে সৌরবিদ্যুৎ। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে আরও ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বাইরে বায়ু, বর্জ্য, পানি বিদ্যুৎ, ভাসমান সৌর ও এগ্রিভোলটাইকসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু সরকারের এই বড় পরিকল্পনার সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে জমি। কারণ ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বিপুল পরিমাণ জমির প্রয়োজন। এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে যেখানে আড়াই থেকে তিন একর জমি লাগে, সেখানে হাজার হাজার মেগাওয়াটের প্রকল্প বাস্তবায়নে জমির প্রয়োজনীয়তা কতটা হবে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, শুধু জমির সংকট নয়—নীতিগত সমস্যা, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার ঘাটতিও সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বড় বাধা।
🔢 সংখ্যায় সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা
২০৩০: মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে
২০৪০: মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে
২০৩০ সালে সম্ভাব্য বিদ্যুতের চাহিদা: ২৪,০০০–২৫,০০০ মেগাওয়াট
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ: ৫,৫০০ মেগাওয়াট
ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ: ৪,৫০০ মেগাওয়াট
অন্যান্য নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি: ৪৫০–৫৫০ মেগাওয়াট
এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে জমি: প্রায় ২.৫–৩ একর
রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প: ৪৬০ মেগাওয়াট
রামপাল প্রকল্পের জমি: ৬৮৫ একর
রামপাল প্রকল্পে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল: ২,১২৭ কোটি টাকা
পিডিবির নিজস্ব অর্থায়ন: ৩৭৫ কোটি টাকা
রামপাল প্রকল্পের মোট প্রস্তাবিত ব্যয়: ২,৫০২ কোটি টাকা
রামপাল উৎপাদনের লক্ষ্য: ২০২৯ সাল
মাতারবাড়ী অ্যাশ পন্ড সৌরবিদ্যুৎ: ৭০ মেগাওয়াট
সরকারি সংস্থাগুলোর চিহ্নিত পতিত জমির প্রতিবেদন: প্রায় ৬০,০০০ একর
যাচাই-বাছাইয়ের পর চিহ্নিত জমি: প্রায় ৩০০ একর
২০৩০ সালে বিদ্যুতের চাহিদা ২৫ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে।
বাড়তে থাকা এই চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি বায়ু, বর্জ্য, পানি বিদ্যুৎ, ভাসমান সৌর ও এগ্রিভোলটাইকসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ, সৌরবিদ্যুৎকে কেন্দ্র করেই নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের বড় একটি অংশ অর্জন করতে চায় সরকার।
রুফটপ সৌরবিদ্যুতে বিশেষ প্রণোদনা
বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি বাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে উৎসাহ দিতে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার।
টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বর্তমান বাজারদর এবং বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক পাওয়া বিভিন্ন দরপত্রের মূল্য বিবেচনায় ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ৮ টাকা ধরা হয়েছে।
এর সঙ্গে বিশেষ প্রণোদনার অংশ হিসেবে ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
কোনও গ্রাহক নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে কম খরচে এ ধরনের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারলে সাশ্রয় হওয়া অর্থ তার লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
🔢 রুফটপ সৌরবিদ্যুতের প্রণোদনা
উৎপাদন ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা: প্রতি ইউনিট ৮ টাকা
মুনাফা: ২০%
প্রিমিয়াম: ১১.২৫%
গ্রিডে সরবরাহের মূল্য: প্রতি ইউনিট ১০.৫০ টাকা
সিস্টেম স্থাপনের শেষ সময়: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭
প্রণোদনা কার্যকর: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত
বিশেষ সুবিধা: নিজস্ব ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ
২০২৭ সালের মধ্যে স্থাপন করলে মিলবে বিশেষ সুবিধা
নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুযায়ী, যেসব গ্রাহক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ তারিখের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবেন এবং নিজস্ব ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, তারা বিশেষ সুবিধা পাবেন।
নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব গ্রাহক পরবর্তী তিন বছর অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য পাবেন।
তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর পর স্থাপিত সিস্টেমের ক্ষেত্রে এই বিশেষ প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না।
ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়াতে এই প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
রামপালে ৪৬০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র
বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনায় রামপালে নেওয়া হয়েছে ৪৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি প্রকল্প।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের ব্লক ‘বি’-তে ৬৮৫ একর জমিতে এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে পিডিবি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা এবং পিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৫ কোটি টাকা ব্যয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দুই উৎস মিলিয়ে প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে কেন্দ্রটি উৎপাদনে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
মাতারবাড়ীর অ্যাশ পন্ডে ৭০ মেগাওয়াট
জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান বিদ্যুৎ প্রকল্পের অব্যবহৃত জায়গাতেও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর অংশ হিসেবে মাতারবাড়ী কোল পাওয়ার প্রকল্পের অ্যাশ পন্ডের জায়গায় ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।
ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং পরামর্শক নিয়োগের কাজ শেষ হয়েছে। এতে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক।
তবে প্রকল্পটি কবে নাগাদ উৎপাদনে যাবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
জাতীয় সংসদও হবে সৌরবিদ্যুতের আওতায়
সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার শুধু সাধারণ গ্রাহক বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সরকার। জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ চাহিদাও সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংসদে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমরা আগামী দিনে এই জাতীয় সংসদের সব কার্যক্রমে ন্যাশনাল গ্রিড থেকে কোনও বিদ্যুৎ গ্রহণ করবো না। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা এই প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চাই।’
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জাতীয় সংসদও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে আসতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা
সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প হিসেবে দেখছে না সরকার। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করতে চায়।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়লে একদিকে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে তৈরি হবে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।
এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ খাতের নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তরুণ ও যুব সমাজের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। এজন্য সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। এতে তারা উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সৌরবিদ্যুৎ খাতে এগিয়ে আসতে পারবেন।’
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সৌরবিদ্যুৎ খাতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগও গড়ে উঠতে পারে।
বড় বাধা সেই জমি
সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনায় ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। কিন্তু এই বিপুল ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে প্রয়োজন হবে বড় পরিমাণ জমি।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিনিয়োগকারীদের নিজেদের জমি কিনে প্রকল্প করতে হলে বিনিয়োগ ব্যয় বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে বাড়বে উৎপাদিত বিদ্যুতের দামও।
এই কারণেই বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সরকার নিজস্ব জমি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। পিপিপি পদ্ধতিতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর তাদের পতিত জমির তালিকা জমা দিয়েছে। সব মন্ত্রণালয় মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার একর জমির প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
এসব জমি যাচাই-বাছাই করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য প্রায় ৩০০ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকার জমি দেবে এবং বিনিয়োগকারীরা সেখানে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন।
তবে জমি নির্বাচনের সময় শুধু জমির পরিমাণ নয়, সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
এক মেগাওয়াটে প্রয়োজন আড়াই থেকে তিন একর
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে জমির প্রয়োজনীয়তা কতটা বেশি, তা বোঝা যায় একটি কেন্দ্রের জমির হিসাব থেকেই।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এক মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে আড়াই থেকে তিন একর জমি প্রয়োজন হয়।
ফলে ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে গেলে বড় ধরনের জমির সংস্থান করতে হবে।
এই বাস্তবতায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং এগ্রিভোলটাইকের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হলে ভূমির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।
‘জমির সংকট নয়, নীতিগত সমস্যাই বড়’
তবে সৌরবিদ্যুৎ খাতের প্রধান বাধা হিসেবে জমির সংকটকে দেখছেন না বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ।
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘জমির সংকটের কারণে নয়, ভালো ধারণা ও নীতিগত সমস্যার কারণে জ্বালানি রূপান্তর পিছিয়ে যাচ্ছে।’
তার মতে, জমির পাশাপাশি সরকারের প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিকতাও জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ‘এক শ্রেণির ব্যবসায়ী চান না সৌরবিদ্যুতের প্রসার ঘটুক এদেশে। দেশের ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ চলে গেলে সেটা তাদের জন্য লাভজনক হবে না বলেই, তারা এটা চান না।’
মোস্তফা আল মাহমুদের ভাষ্য, আগের সরকারগুলো সৌরবিদ্যুতের প্রসারে নানা কথা বললেও বাস্তবে কোনো কাজ এগোতে পারেনি। বর্তমান সরকার নতুন করে এ খাতকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে।
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট কাটাতে সৌরবিদ্যুৎ ভালো ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মত দেন তিনি।
সামনে বড় পরীক্ষা বাস্তবায়নের
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে ছাদভিত্তিক ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটসহ মোট ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা সামনে রয়েছে। এর বাইরে অন্যান্য নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি থেকে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রামপালে ৪৬০ মেগাওয়াটের বড় প্রকল্প, মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াটের উদ্যোগ, রুফটপ সৌরবিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কেনার প্রণোদনা, সরকারি জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার।
তবে পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
জমি, বিনিয়োগ, সঞ্চালন অবকাঠামো, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি—এই পাঁচটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা কতটা অর্জন করা সম্ভব হবে।
কারণ ২০৩০ সালে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা যদি ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছে যায়, তখন আমদানিনির্ভর জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ শুধু পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নয়, বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
জেটিভি নিউজ বাংলা | বিশেষ প্রতিবেদন
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম