মোবাইলের নেশায় হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব, দায় কার?
খাবার থেকে ঘুম—সবকিছুতেই মোবাইল; মাঠ ছেড়ে গেম-কার্টুনে শিশুরা, বাড়ছে উদ্বেগ
জেটিভি নিউজ বাংলা, বিশেষ প্রতিবেদন
একসময় শিশুর শৈশব মানেই ছিল মাঠে খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প আর বিকেল হলেই বাইরে ছুটে চলা। কিন্তু সেই চেনা শৈশব এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে স্মার্টফোনের ছোট্ট পর্দায়।
ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল, খাবার খাওয়ার সময় মোবাইল, অবসরে মোবাইল—এভাবেই অনেক শিশুর দিনের বড় একটি অংশ কেটে যাচ্ছে স্মার্টফোন, গেম ও কার্টুনে। বাইরে গিয়ে খেলাধুলার বদলে ঘরে বসে মোবাইল গেম কিংবা ভিডিও দেখাতেই যেন বেশি আনন্দ। এমনকি অনেক শিশুকে মোবাইল ফোনে কার্টুন বা ভিডিও না দেখালে খাবার খাওয়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অভিভাবকদের কাছে এটি হয়তো শিশুকে সাময়িকভাবে শান্ত রাখার সহজ উপায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই অভ্যাস শিশুর শারীরিক সক্রিয়তা, ঘুম, পারিবারিক যোগাযোগ এবং স্বাভাবিক সামাজিক ও মানসিক বিকাশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
মোবাইল ছাড়া খাবারই খেতে চায় না অনেক শিশু
শিশুকে খাবার খাওয়াতে গিয়ে হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া এখন অনেক পরিবারের নিয়মিত চিত্র। মোবাইলে কার্টুন বা ভিডিও চালিয়ে দিলেই শিশু অনায়াসে খাবার খেয়ে নেয়—এমন অভ্যাস থেকেই ধীরে ধীরে খাবারের সঙ্গে মোবাইলের সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।
ফলে ক্ষুধা লাগা, খাবারের স্বাদ নেওয়া কিংবা পেট ভরে যাওয়ার স্বাভাবিক অনুভূতির পরিবর্তে শিশুর মনোযোগ চলে যাচ্ছে স্ক্রিনে।
শিশুকে ব্যস্ত রাখার জন্য প্রতিবার মোবাইল ব্যবহার করলে তার মধ্যে নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই খাবারের সময় মোবাইলের পরিবর্তে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা ও স্বাভাবিক পরিবেশে খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
মাঠ ছেড়ে মোবাইল গেমে শিশুরা

শিশুর সুস্থ বিকাশে খেলাধুলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে খেলতে গিয়ে শিশু শুধু শারীরিকভাবে সক্রিয় হয় না; একই সঙ্গে অন্য শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ, দলবদ্ধভাবে কাজ করা, নিয়ম মানা, জয়-পরাজয় মেনে নেওয়া এবং সমস্যা সমাধানের মতো সামাজিক দক্ষতাও অর্জন করে।
কিন্তু মাঠের পরিবর্তে মোবাইল গেম শিশুর প্রধান বিনোদন হয়ে উঠলে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যায়। দীর্ঘ সময় বসে থাকা ও স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকার কারণে ঘুমের সমস্যা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং ওজনসংক্রান্ত নানা সমস্যা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চোখে বাড়ছে চাপ
শিশুরা দীর্ঘ সময় কাছ থেকে মোবাইলের স্ক্রিন দেখলে চোখে চাপ পড়তে পারে। চোখ শুষ্ক হওয়া, চোখে জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা কিংবা দূরের জিনিস দেখতে অসুবিধার মতো সমস্যা দেখা দিলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
তবে শুধু মোবাইল ব্যবহারের কারণেই শিশু অন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এমন সরাসরি দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে করা ঠিক নয়। বরং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে চোখের ওপর চাপ এবং শিশুদের বাইরে সময় কাটানোর ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
তাই শিশুর চোখ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে স্ক্রিন ব্যবহারে বয়স উপযোগী সীমা এবং নিয়মিত বিরতির অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
দায় কি শুধু শিশুর?
শিশু মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়লে শুধু শিশুকেই দায়ী করা কতটা যুক্তিসঙ্গত—এখন সেই প্রশ্নই সামনে আসছে।
জেটিভি নিউজ বাংলার সম্পাদক ও প্রকাশক রুমন জোয়ার্দ্দার জনি মনে করেন, শিশুর মোবাইল আসক্তির জন্য শিশুকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। পরিবার এবং অভিভাবকদের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি মনে করেন, শিশুকে খাওয়ানো, কান্না থামানো কিংবা নিজের ব্যস্ততার সময় তাকে শান্ত রাখার জন্য যদি নিয়মিত মোবাইল ফোন দেওয়া হয়, তাহলে একসময় শিশুর কাছে মোবাইলই হয়ে উঠতে পারে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম।
রুমন জোয়ার্দ্দার জনির মতে, সন্তানের সুন্দর জীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে একজন সচেতন ও আদর্শবান মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাবাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও শিশুর সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে হবে।
সন্তানের প্রতিটি চাহিদা সঙ্গে সঙ্গে পূরণ নয়
শিশু কিছু চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে তা পূরণ করে দেওয়ার অভ্যাসও পরিবর্তন করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
তার বক্তব্য, অতিরিক্ত চকলেট খাওয়া, অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আসক্তি কিংবা মোবাইল ফোন ব্যবহারের মতো বদভ্যাস ছোটবেলা থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শিশুকে শুধু বকাঝকা বা ভয় দেখিয়ে নয়, বরং ভালো-মন্দ বুঝিয়ে এবং ভালোবাসার মাধ্যমে সঠিক অভ্যাসে অভ্যস্ত করতে হবে।
বিশেষ করে মোবাইল ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে শিশুর সঙ্গে তার বয়স অনুযায়ী সহজ ভাষায় আলোচনা করা প্রয়োজন।
বাবা-মায়ের আচরণও শিশুকে প্রভাবিত করে
শিশু সাধারণত পরিবারের বড়দের আচরণ অনুকরণ করে। বাবা-মা যদি নিজেরাই দিনের বেশিরভাগ সময় মোবাইলে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শিশুকে মোবাইল থেকে দূরে রাখা কঠিন।
তাই অভিভাবকদেরও নিজেদের মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পরিবারের সবাই মিলে খাবার খাওয়ার সময় মোবাইল দূরে রাখা, গল্প করা, বই পড়া, হাঁটতে যাওয়া কিংবা খেলাধুলা করার মতো অভ্যাস শিশুকে বাস্তব জীবনের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
স্কুলে সচেতনতা তৈরির আহ্বান
শিশুর মোবাইল আসক্তি নিয়ন্ত্রণে শুধু পরিবার নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।
স্কুলে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ঝুঁকি, অনলাইন গেমিং এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।
রুমন জোয়ার্দ্দার জনি মনে করেন, প্রতিটি স্কুল-কলেজ এবং সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শিশু ও অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। সরকারের পাশাপাশি শিক্ষক, চিকিৎসক, অভিভাবক ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
মোবাইল কেড়ে নেওয়া নয়, অভ্যাস বদলানো জরুরি
বর্তমান সময়ে শিশুকে প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা বাস্তবসম্মত নয়। পড়াশোনা ও প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের প্রয়োজন রয়েছে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত মোবাইল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা নয়; বরং নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা।
শিশুর বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করতে হবে। ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে। পাশাপাশি প্রতিদিন পর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা, বই পড়া এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
চিকিৎসা ও শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শও হলো—শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের পাশাপাশি তার ঘুম, শারীরিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক যোগাযোগ এবং বয়স উপযোগী বিকাশের প্রয়োজনগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া।
আজকের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে আগামী প্রজন্ম
একটি স্মার্টফোন হয়তো শিশুকে কয়েক ঘণ্টা শান্ত রাখতে পারে। কিন্তু সেই কয়েক ঘণ্টার বিনিময়ে যদি শিশুর খেলাধুলা, ঘুম, পারিবারিক সম্পর্ক ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়, তাহলে অভিভাবকদের অবশ্যই বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে।
শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়ার আগে প্রশ্ন হওয়া উচিত—সন্তানের প্রয়োজনেই কি মোবাইল দিচ্ছি, নাকি আমাদের ব্যস্ততার কারণে তাকে মোবাইলনির্ভর করে তুলছি?
শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ শুধু ভালো ফলাফল বা ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না। সুস্থ শরীর, স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ, সামাজিক দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং পরিবারের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্কও তার ভবিষ্যৎ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই এখনই সময় শিশুকে মোবাইলের পর্দা থেকে বের করে খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনার। বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা এবং বাস্তব জীবনের আনন্দের সঙ্গে শিশুকে যুক্ত করার।
কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের প্রজন্ম। তাদের শৈশব যদি মোবাইলের পর্দায় বন্দি হয়ে যায়, তাহলে হারিয়ে যাবে শুধু একটি প্রজন্মের খেলাধুলা নয়—হারিয়ে যেতে পারে তাদের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও।
প্রশ্ন তাই একটাই—মোবাইলের নেশায় যখন হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব, তখন দায় শুধু শিশুর, নাকি আমাদের সবার?
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য,সাহস, সংযোগ…….
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম