জেটিভি নিউজ বাংলা ডেস্ক
🔴 প্রতি ১০ জনে একজন প্রবীণ, ২০৫০ সালে প্রতি ৫ জনে একজন: বার্ধক্যের বাংলাদেশের প্রস্তুতি কোথায়?
১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি ষাটোর্ধ্ব মানুষ | ২০৫০ সালে প্রবীণ হবেন প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ | স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক নিরাপত্তা, একাকিত্ব ও নির্যাতন—বাড়ছে উদ্বেগ
জেটিভি নিউজ বাংলা ডেস্ক:
প্রবীণ দিবসের আনুষ্ঠানিকতা এলেই সমাজে তাঁদের অবদান নিয়ে আলোচনা হয়। তাঁদের সম্মান জানানো হয়, জীবনের দীর্ঘ পথচলার কথা স্মরণ করা হয়। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই চাপা পড়ে যায়—যাঁরা তাঁদের শ্রম, মেধা, অভিজ্ঞতা ও ত্যাগ দিয়ে আজকের সমাজ গড়ে দিয়ে গেছেন, সেই প্রবীণ মানুষগুলো এখন কেমন আছেন?
বাংলাদেশ দ্রুত জনমিতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের মোট জনসংখ্যায় প্রবীণ মানুষের অংশ ক্রমেই বাড়ছে। ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে দেড় কোটির ঘর ছাড়িয়েছে। আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়বে।
ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে শুধু পরিবারের একটি বিষয় কিংবা সামাজিক কল্যাণের একটি ছোট অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা, পরিবারব্যবস্থা এবং জাতীয় ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয়।
📊 দেশে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি।
দেশের মোট জনসংখ্যার হিসাবে এই জনগোষ্ঠীর অংশ ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।
এক দশক আগে, অর্থাৎ ২০১১ সালে, ষাটোর্ধ্ব মানুষের হার ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
অর্থাৎ মাত্র এক দশকের ব্যবধানে দেশের জনসংখ্যায় প্রবীণ মানুষের অংশ বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জনসংখ্যার বয়স কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইউএনএফপিএর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের বয়স ৬০ বছরের বেশি।
অর্থাৎ বর্তমানে দেশের প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় একজন প্রবীণ।
এই সংখ্যার প্রতিটি মানুষের সঙ্গে রয়েছে আলাদা একটি জীবনকাহিনি। কেউ দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন, কেউ কৃষিকাজ করেছেন, কেউ ব্যবসা করেছেন, কেউ পরিবার সামলেছেন, আবার কেউ শ্রম দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছেন।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে তাঁদের জীবনের প্রয়োজনও বদলে যায়। কর্মক্ষম বয়সে যাঁরা অন্যের দায়িত্ব নিয়েছেন, বার্ধক্যে তাঁদের অনেকেরই অন্যের সহায়তার প্রয়োজন হয়।
🚨 ২০৫০ সালে প্রতি পাঁচজনে একজন প্রবীণ!
বর্তমান চিত্রের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভবিষ্যতের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন।
ইউএনএফপিএর হিসাবে, ২০৫০ সালে বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছাবে।
তখন মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ মানুষের বয়স হবে ৬০ বছরের বেশি।
অর্থাৎ তখন প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন হবেন প্রবীণ।
এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের জনমিতিক পরিবর্তন।
আজ যে বিষয়টি ১০ জনের মধ্যে একজনের বাস্তবতা, আগামী কয়েক দশকে সেটিই পাঁচজনের মধ্যে একজনের বাস্তবতায় পরিণত হবে।
ফলে এখন থেকেই প্রশ্ন উঠছে—এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতাল, প্রবীণবান্ধব চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন, নিরাপদ পরিবহন, বাসস্থান, পারিবারিক যত্ন এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ আমরা কতটা নিশ্চিত করতে পারছি?
বাস্তবতা হলো, এই পরিবর্তনের তুলনায় প্রস্তুতি এখনো অনেক সীমিত।
🏥 প্রথম সংকট: প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কোথায়?
বার্ধক্যের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক সক্ষমতায় পরিবর্তন আসে। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা দেয় দীর্ঘস্থায়ী রোগ।
প্রবীণদের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, আর্থ্রাইটিস, ছানি ও স্মৃতিভ্রংশের মতো রোগের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
এসব রোগের ক্ষেত্রে একবার চিকিৎসা নিলেই সমস্যা শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন হয় নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ।
কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রবীণবান্ধব সেবা প্রায় অনুপস্থিত।
হাসপাতালের দীর্ঘ সারি, এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে যাওয়া, পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করা কিংবা চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া—এসব বিষয় একজন তরুণের জন্য যতটা সহজ, একজন প্রবীণের জন্য ততটা নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান স্বাস্থ্যসুবিধা ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
🏥 গ্রাম-মফস্বলের প্রবীণদের দুর্ভোগ আরও বেশি
শহরের বাইরে বসবাসকারী প্রবীণদের সমস্যা আরও প্রকট।
গ্রাম বা মফস্বলের একজন প্রবীণকে অনেক সময় উন্নত চিকিৎসার জন্য উপজেলা বা জেলা শহর পেরিয়ে বড় কোনো শহরে যেতে হয়।
বয়সের কারণে দীর্ঘ যাত্রা শারীরিকভাবে কষ্টকর। এর সঙ্গে যুক্ত হয় যাতায়াতের খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সঙ্গে একজন স্বজনকে নেওয়ার প্রয়োজন।
ফলে শুধু রোগের চিকিৎসাই নয়, চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোও তাঁদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত প্রবীণদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু করা গেলে প্রাথমিক পর্যায়েই অনেক সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
💰 দ্বিতীয় সংকট: বার্ধক্যে আর্থিক নিরাপত্তা
প্রবীণদের দ্বিতীয় বড় সমস্যা আর্থিক নিরাপত্তা।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ তাঁদের কর্মজীবনে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেছেন। তাঁদের অনেকেরই চাকরি শেষে নির্দিষ্ট পেনশন নেই।
ফলে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার পরও জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করতে হয়।
একজন মানুষ সারা জীবন কাজ করার পরও যদি বার্ধক্যে নিয়মিত আয় বা পেনশনের নিশ্চয়তা না পান, তাহলে বয়সজনিত চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ তাঁর জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
💵 বয়স্ক ভাতা: ৬০০ টাকা কতটা যথেষ্ট?
বাংলাদেশে ১৯৯৮ সালে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি চালু হয়।
একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৮ লাখ মানুষ মাসে ৬০০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা পান।
কিন্তু বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করলে এই অর্থ খুবই সামান্য।
খাবার, ওষুধ, যাতায়াতসহ একজন প্রবীণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে ৬০০ টাকা কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
আরও বড় বিষয় হলো, দেশে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা যেখানে ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি, সেখানে প্রায় ৫৮ লাখ সুবিধাভোগী মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় সীমিত।
ফলে লাখো প্রবীণ এখনো এই সুবিধার বাইরে।
এ কারণে অনেক প্রবীণকে বয়সের ভার সত্ত্বেও নিজেদের জীবিকার জন্য কাজ করে যেতে হচ্ছে।
🟢 ২০২৩ সালের সার্বজনীন পেনশন: আশার আলো, তবে সুরক্ষা সবার জন্য নয়
২০২৩ সালে চালু হওয়া সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা দেশের প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে বিপুলসংখ্যক প্রবীণ এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে রয়েছেন।
বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মজীবন কাটানো মানুষের জন্য অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
তাই প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা শুধু বয়স্ক ভাতার ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
💔 তৃতীয় সংকট: একাকিত্ব
প্রবীণ জীবনের এমন একটি সংকট আছে, যা বাইরে থেকে সহজে দেখা যায় না—একাকিত্ব।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবারব্যবস্থা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
সন্তানরা পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে শহরে চলে যাচ্ছেন। অনেকে বিদেশেও পাড়ি জমাচ্ছেন।
অন্যদিকে বাবা-মা থেকে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে কিংবা শহরের ফ্ল্যাটে।
ফলে অনেক প্রবীণ দিনের বড় একটি সময় একা কাটাচ্ছেন।
একসময় যে পরিবারে সন্তান, নাতি-নাতনি ও আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে ঘর সরব থাকত, সেই পরিবারেই এখন অনেক প্রবীণের দিন কাটছে নীরবতায়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হওয়ার কারণে পরিবার ও সমাজভিত্তিক যত্নব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
দীর্ঘস্থায়ী নিঃসঙ্গতা প্রবীণদের মধ্যে বিষণ্নতা ও স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই প্রবীণদের জন্য চিকিৎসা ও ওষুধের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
🚨 চতুর্থ সংকট: অবহেলা ও নির্যাতন
প্রবীণদের অবহেলা ও নির্যাতন সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনেকাংশে অস্বীকৃত বাস্তবতা।
নির্যাতন মানেই শুধু শারীরিক আঘাত নয়।
কটু কথা বলা, অপমান করা, সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা, উপেক্ষা করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দেওয়া কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে একা ফেলে রাখা—এসবও নির্যাতনের রূপ।
কিন্তু অনেক প্রবীণ তাঁদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা প্রকাশ করেন না।
কারণ হতে পারে সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয় কিংবা সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে না চাওয়া।
ফলে ঘরের ভেতরে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না।
🏠 বৃদ্ধাশ্রম নয়, ঘরের ভেতরেও আছে অদৃশ্য নির্বাসন
বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমকে অনেক সময় সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু সমস্যাটি শুধু বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণদের নিয়ে নয়।
একজন প্রবীণ একই পরিবারের সঙ্গে থেকেও একা হয়ে যেতে পারেন।
একই ছাদের নিচে থেকেও যদি তাঁর কথা কেউ না শোনে, মতামতের মূল্য না থাকে, প্রয়োজনের সময় পাশে কেউ না থাকে—তাহলে সেই মানুষটি এক ধরনের অদৃশ্য নির্বাসনের জীবন কাটাতে পারেন।
এই বাস্তবতাটিও সমাজকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
⚖️ আইন ও নীতি আছে, প্রয়োজন প্রয়োগ
প্রবীণদের সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশে ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন এবং জাতীয় প্রবীণ নীতি রয়েছে।
এগুলো প্রবীণদের অধিকার ও সুরক্ষার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করেছে।
কিন্তু শুধু আইন বা নীতিমালা থাকলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন—
- আইনের কার্যকর প্রয়োগ;
- প্রবীণদের অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা;
- পরিবারে দায়িত্বশীল আচরণ;
- সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বৃদ্ধি;
- স্বাস্থ্যসেবায় প্রবীণদের অগ্রাধিকার;
- স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা।
📌 কী কী উদ্যোগ এখন জরুরি?
🏥 ১. সরকারি হাসপাতালে আলাদা প্রবীণ কাউন্টার
সরকারি হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য আলাদা কাউন্টার চালু করা প্রয়োজন। তাঁদের জন্য স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
🩺 ২. ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে প্রবীণদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু করা প্রয়োজন। এতে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা সহজ হবে।
💰 ৩. বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও আওতা বৃদ্ধি
বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পাশাপাশি প্রকৃত অসহায় প্রবীণদের তালিকাভুক্ত করে সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
🚌 ৪. প্রবীণবান্ধব গণপরিবহন
গণপরিবহনে সহজে ওঠানামা, বসার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার।
🚶 ৫. নিরাপদ ফুটপাত ও পার্ক
ফুটপাত, পার্ক ও অন্যান্য জনপরিসর এমনভাবে তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে প্রবীণরা নিরাপদে হাঁটাচলা ও সময় কাটাতে পারেন।
🏠 ৬. স্থানীয় পর্যায়ে দিবাযত্ন কেন্দ্র
প্রবীণদের একাকিত্ব কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে দিবাযত্ন কেন্দ্র ও সামাজিক ক্লাব গড়ে তোলা যেতে পারে।
👨👩👧 পরিবারের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
প্রবীণদের দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়।
পরিবারই একজন প্রবীণের প্রথম আশ্রয়।
প্রতিদিন কয়েক মিনিট তাঁদের পাশে বসা, কেমন আছেন জিজ্ঞেস করা, তাঁদের সঙ্গে কথা বলা কিংবা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের মতামত নেওয়া—এসব ছোট বিষয় একজন প্রবীণের জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সন্তান দূরে থাকলেও নিয়মিত ফোন করা, ভিডিও কল করা এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত পাশে দাঁড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
একজন প্রবীণের কাছে সবসময় অর্থ বা দামি উপহার সবচেয়ে বড় বিষয় নয়। অনেক সময় একটু সময়, সম্মান এবং আপনজনের মনোযোগই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
🧓 প্রবীণরা শুধু সাহায্য নেওয়ার মানুষ নন
প্রবীণদের শুধু সহায়তার পাত্র হিসেবে দেখা হলে তাঁদের জীবনের বড় একটি দিক অদৃশ্য থেকে যায়।
তাঁদের কাছে রয়েছে—
জীবনের অভিজ্ঞতা, ইতিহাসের সাক্ষ্য এবং সংকট মোকাবিলার প্রজ্ঞা।
সুস্থ ও সক্ষম প্রবীণরা শিক্ষা, সমাজসেবা ও পরামর্শদানের মতো কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা দিতে পারেন। অভিজ্ঞ কৃষক তরুণ কৃষকদের পরামর্শ দিতে পারেন। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী তরুণ উদ্যোক্তাদের পথ দেখাতে পারেন।
অর্থাৎ প্রবীণদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা হলে সমাজও লাভবান হবে, প্রবীণরাও নিজেদের প্রয়োজনীয় মনে করবেন।
🔄 আজ যিনি প্রবীণ, একদিন ছিলেন তরুণ
প্রবীণ দিবসের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হতে পারে—আজ যিনি প্রবীণ, একদিন তিনি তরুণ ছিলেন।
আজকের তরুণরাও একদিন বয়সের ভারে প্রবীণ হবেন।
আজ আমরা প্রবীণদের সঙ্গে যে আচরণ করছি, ভবিষ্যতে সমাজ আমাদের সঙ্গেও অনেকাংশে সেই আচরণ করতে পারে।
তাই প্রবীণের যত্ন নেওয়া শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি নিজেদের ভবিষ্যতের জন্যও একটি বিনিয়োগ।
🔔 প্রবীণ দিবস কি শুধু একদিনের আনুষ্ঠানিকতা?
প্রবীণ দিবসে আলোচনা হবে, অনুষ্ঠান হবে, শুভেচ্ছা জানানো হবে—তারপর আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে, এমনটি হলে এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
প্রবীণদের জন্য প্রয়োজন বছরজুড়ে কার্যকর উদ্যোগ।
রাষ্ট্রকে দিতে হবে স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা।
সমাজকে দিতে হবে সম্মান ও সহমর্মিতা।
পরিবারকে দিতে হবে সময়, ভালোবাসা ও নিরাপত্তা।
🟠 সামনে বড় পরিবর্তন, প্রস্তুতি এখনই
বাংলাদেশে আজ ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি।
২০২৫ সালে তাঁদের অংশ প্রায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ।
আর ২০৫০ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ।
অর্থাৎ সামনে এমন বাংলাদেশ আসছে, যেখানে প্রতি পাঁচজন মানুষের একজন প্রবীণ।
এই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নিতে হলে এখনই পরিকল্পনা করতে হবে।
প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগ, নিরাপদ চলাচল, পারিবারিক যত্ন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা শুধু তাঁদের প্রতি দায়িত্ব নয়—এটি একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।
বার্ধক্য কোনো রোগ নয়, জীবনের স্বাভাবিক একটি পর্যায়।
তাই এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের মর্যাদা কমবে না; বরং তাঁর অভিজ্ঞতা আরও মূল্যবান হয়ে উঠবে।
প্রবীণ দিবস যেন বছরে একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে।
রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—এই তিন স্তরের সম্মিলিত উদ্যোগে এমন সংস্কৃতি গড়ে উঠুক, যেখানে বার্ধক্য হবে সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদার একটি পর্যায়; একাকিত্ব, অবহেলা ও অনিশ্চয়তার নয়।
কারণ আজকের প্রবীণরাই একসময় আমাদের বর্তমান তৈরি করেছেন। আর আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ।
জেটিভি নিউজ বাংলা
বিশেষ প্রতিবেদন | প্রবীণ দিবস
প্রতিবেদনের মূল বার্তা:
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম