শেখ হাসিনাকে ফেরাতে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন
জেটিভি নিউজ বাংলা, ডেস্ক
ফাইল ছবি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনাসহ যেসব আসামিকে ফেরত আনার জন্য প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, তা যেন দ্রুত সম্পন্ন হয়—বাংলাদেশ এমনটাই প্রত্যাশা করে।
রোববার (৪ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
এর আগে শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকায় আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে সাংবাদিকরা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে জানতে চান। জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি রয়েছে। তবে শুধু আইনি প্রক্রিয়া থাকলেই হবে না, এর পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রয়োজন।
দ্রুত প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শেষ করার প্রত্যাশা
শামা ওবায়েদ বলেন, আসামিদের ফেরত আনার জন্য যে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া চলছে, সেটি যেন আরও দ্রুত সম্পন্ন হয়, ভারত সরকার সে বিষয়ে নজর দেবে বলে বাংলাদেশ আশা করে।
প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাসহ আসামিদের বাংলাদেশে ফেরত আনা সম্ভব কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই সম্ভব।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, চুক্তি অনুযায়ী আসামিদের ফেরত আনা সম্ভব এবং সেই প্রক্রিয়াই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বাংলাদেশ এ বিষয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যের পর বাংলাদেশের অবস্থান
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে শনিবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের অনুরোধের বিষয়ে ভারতে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিষয়টির সঙ্গে আদালত সম্পৃক্ত থাকায় শেখ হাসিনাকে কবে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বলা সম্ভব নয় বলেও তিনি জানান।
হাইকমিশনারের ওই বক্তব্যের পরদিনই বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রয়োজন।
ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রত্যাশা যে শুধু আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে—প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে গুঞ্জন নাকচ
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুঞ্জনও নাকচ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
প্রধানমন্ত্রী সান ফ্রান্সিসকো যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু এফবিআইয়ের মামলা কিংবা ভিসা জটিলতার কারণে তিনি সেখানে যেতে পারেননি—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সাংবাদিকরা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে জানতে চান।
জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, গুঞ্জনে কান দেওয়া ঠিক নয়। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মিডিয়ার প্রতিনিধিরা সত্য যাচাই করে খবর প্রকাশ করবেন—এটাই সরকারের প্রত্যাশা।
অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর সান ফ্রান্সিসকো সফর বাতিল হওয়ার পেছনে এফবিআইয়ের মামলা বা ভিসা জটিলতার যে দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, সেটিকে ভিত্তি করে সংবাদ না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ছয় মাসে ব্যস্ত সময় পার করেছেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফর ও কর্মসূচি প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ বলেন, গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছেন।
এই সময়ে চীন ও মালয়েশিয়া সফরের পাশাপাশি জাতিসংঘ সফরও তিনি সংক্ষিপ্ত ও প্রয়োজনীয়ভাবে সম্পন্ন করেছেন বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এসব সফরে প্রয়োজনীয় দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠক সম্পন্ন করার পর প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে এসেছেন।
এর মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সফরগুলোর বিষয়ে একটি ধারাবাহিকতা তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুঞ্জনের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর বাস্তব সফরসূচি ও সরকারি তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও তার বক্তব্যে উঠে আসে।
সান ফ্রান্সিসকো যাওয়ার পরিকল্পনাই ছিল না
প্রধানমন্ত্রী সান ফ্রান্সিসকো যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন—এমন ধারণাও সরাসরি নাকচ করেন শামা ওবায়েদ।
তিনি জানান, সান ফ্রান্সিসকোতে প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে যাওয়ার পরিবর্তে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল।
ওই প্রতিনিধিদলে ছিলেন আইসিটি উপদেষ্টা, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, অর্থ উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ নিজে।
অর্থাৎ সান ফ্রান্সিসকো সফর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের আলোচনা বা গুঞ্জন ছড়িয়েছে, তার সঙ্গে সরকারের পরিকল্পনার বাস্তব চিত্রের মিল নেই বলে জানান তিনি।
ইউসি বার্কলে ও অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশটির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টিও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে—ইউসি বার্কলে এবং অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হলে বাংলাদেশের শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি এবং জ্ঞানভিত্তিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হলে তা দেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে জানান শামা ওবায়েদ।
হাইটেক কোম্পানির বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগের আশা
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, প্রযুক্তি খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, হাইটেক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে এলে কিংবা যৌথ উদ্যোগে যুক্ত হলে এর সুফল পাওয়া যাবে।
প্রযুক্তি খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি খাত এবং কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে—এমন প্রত্যাশাও তুলে ধরেন তিনি।
শামা ওবায়েদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ—তিনটি ক্ষেত্রেই সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরির চেষ্টা চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফর রয়েছে
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী তুরস্ক সফর নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফরের কর্মসূচি রয়েছে। তবে সফরটি কখন এবং কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনই প্রকাশ করেননি তিনি।
শামা ওবায়েদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফর রয়েছে। তবে কখন, কোথায় সফর হবে, তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে।
অর্থাৎ তুরস্ক সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও সফরের নির্দিষ্ট তারিখ, স্থান ও কর্মসূচি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা করতে হবে।
প্রত্যর্পণ ও কূটনৈতিক তৎপরতা
একদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতীয় পক্ষ আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকার কথা জানাচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রত্যাশা জানাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের বক্তব্যে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করেছেন, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় আসামিদের ফেরত আনার সুযোগ রয়েছে এবং বাংলাদেশ সেই প্রক্রিয়াই এগিয়ে নিচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত সরকার দ্রুততার সঙ্গে বিষয়টি দেখবে বলেও বাংলাদেশ প্রত্যাশা করছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জনকে ভিত্তি না করে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রত্যর্পণ চুক্তি, প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে গুঞ্জন, সান ফ্রান্সিসকো সফরের পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা, হাইটেক কোম্পানির বিনিয়োগ এবং প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য তুরস্ক সফর—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন শামা ওবায়েদ।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য, সাহস, সংযোগ……
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম