শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ হ্যান্ডলিং সরাসরি দেখবেন যাত্রীরা, স্থাপন ৩২ সিসিটিভি ক্যামেরা
নিজস্ব প্রতিবেদক | জেটিভি নিউজ বাংলা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ হ্যান্ডলিং কার্যক্রম সরাসরি দেখার ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এ লক্ষ্যে বিমানবন্দরের আটটি লাগেজ বেল্ট এলাকায় ৩২টি সিসিটিভি ক্যামেরা ও ৬৫ ইঞ্চির ১৮টি মনিটর স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো থেকে শুরু করে যাত্রীদের লাগেজ বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ সরাসরি দেখতে পারবেন যাত্রীরা।
বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, লাগেজ ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে যাত্রীরা তাদের লাগেজ কোথায় রয়েছে এবং ব্যবস্থাপনার কোনো পর্যায়ে সমস্যা হয়েছে কি না, তা সরাসরি দেখতে পারবেন।
বেবিচক জানায়, প্রতিটি লাগেজ বেল্টের ব্যাগেজ এলাকায় চারটি করে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে লাগেজ নামানো, পরিবহন, বাছাই এবং বেল্টে পৌঁছানোর দৃশ্য মনিটরে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এ উদ্যোগের ফলে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীদের উদ্বেগ কমবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
হাইকোর্টের নির্দেশনার পর স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন
বিমানবন্দরে লাগেজ হারানো, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কাটা ও চুরির ঘটনা প্রতিরোধে গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ গত ১০ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের আইন-১ শাখা থেকে জারি করা হয়।
ছয় সদস্যের এ কমিটি তদন্ত ও মূল্যায়ন শেষে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একাধিক সুপারিশ করে। এসব সুপারিশের মধ্যে লাগেজ পরিবহনের প্রতিটি ধাপে নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার, কর্মীদের জবাবদিহি এবং যাত্রীদের সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান। সদস্য হিসেবে ছিলেন বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারলাইন অপারেটরস কমিটির (এওসি) চেয়ারম্যান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাহক সেবা ও কার্গো বিভাগের পরিচালক এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের পরিচালক।
লাগেজ ব্যবস্থাপনায় ছয় দফা সুপারিশ

কমিটির ছয় দফা সুপারিশের মধ্যে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো থেকে শুরু করে আগমন এলাকার লাগেজ বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করার বিষয়টি ছিল অন্যতম। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে লাগেজ পরিবহনের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো অনিয়ম বা সমস্যা দেখা দিলে তা শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা করা হয়।
এ ছাড়া কমিটি আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুপারিশ করে।
১. সিসিটিভির আওতা বাড়ানো: বিমানবন্দরের যেসব এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতার বাইরে রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ক্যামেরা স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। এর মাধ্যমে লাগেজ ব্যবস্থাপনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২. কর্মীদের শরীরে ক্যামেরা ব্যবহার: লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের শরীরে ক্যামেরা চালু রাখার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি সংগৃহীত সিসিটিভি ও অন্যান্য ক্যামেরার ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণের কথা বলা হয়, যাতে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ঘটনার তথ্য যাচাই করা যায়।
৩. পর্যাপ্ত জনবল ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ: লাগেজ ব্যবস্থাপনার প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয় কমিটি। কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিরাপদ লাগেজ ব্যবস্থাপনা এবং মানসম্মত পরিচালন পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুপারিশও করা হয়।
৪. ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাগের বিষয়ে আগাম সতর্কতা: যাত্রার মূল বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে কোনো ব্যাগ কাটা, খোলা বা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই আগাম সতর্কবার্তা পাঠানোর সুপারিশ করা হয়। এ ক্ষেত্রে ই-মেইলের মাধ্যমে ব্যাগের ছবি পাঠানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাগে পরিচিতি-স্টিকার লাগানোর কথা বলা হয়, যাতে পরবর্তী পর্যায়ে বিষয়টি শনাক্ত ও যাচাই করা সহজ হয়।
৫. অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা: লাগেজ চুরি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সুপারিশ করেছে কমিটি। একই সঙ্গে সিসিটিভি ও কর্মীদের শরীরে ধারণ করা ক্যামেরার ফুটেজ নিয়মিত নিরীক্ষা এবং আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৬. যাত্রী সচেতনতা ও তথ্য প্রচার: মূল্যবান সামগ্রী লাগেজে না রাখার বিষয়ে যাত্রীদের সচেতন করতে প্রচারণা চালানোর সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচারের জন্য নিজস্ব জনসংযোগ দল বা গণমাধ্যম সেল গঠনের কথা বলা হয়। প্রমাণ বা যাচাই ছাড়া নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও ছিল কমিটির প্রতিবেদনে।
লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর লক্ষ্য

বেবিচক জানিয়েছে, যাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষা, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর ও যাত্রীবান্ধব সেবা সম্প্রসারণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বিমানবন্দরের লাগেজ বেল্ট এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা ও বড় পর্দার মনিটর স্থাপনের উদ্যোগকে এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে যাত্রীরা লাগেজ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপ সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে লাগেজ পরিবহনে স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি বাড়বে এবং যাত্রীদের উদ্বেগ কমবে বলে আশা করছে বেবিচক।
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম