নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন! পোলাও চাল ২৩০ টাকা, বাড়ল আদা-রসুন-লেবুর দামও
আটা-ময়দার ঊর্ধ্বমুখী দামে দিশেহারা ক্রেতা, চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে মাছ-মাংস ও সবজি | বাজারে নজরদারির অভাব নিয়ে ক্ষোভ
জেটিভি নিউজ বাংলা ডেস্ক:
ছবি ঃ জেটিভি নিউজ বাংলা
রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে যেন স্বস্তি ফিরছেই না। একদিকে পোলাও চাল, আটা ও ময়দার দাম বেড়েই চলেছে, অন্যদিকে হঠাৎ করেই বেড়েছে আদা, রসুন ও লেবুর দাম। পণ্যভেদে চাল ও আটা-ময়দার দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে চীনা আদার দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং চীনা রসুনের দাম ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়েছে। লেবুর দামও বেড়েছে হালিপ্রতি ১৫ থেকে ৩০ টাকা।
এদিকে, শীতের আগাম সবজি বাজারে আসতে শুরু করলেও সব পণ্যের দাম কমেনি। কিছু সবজির দাম গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ টাকা কমলেও শিম, ফুলকপি ও অন্যান্য সবজির পাশাপাশি টমেটোর দামও ক্রেতাদের চাপে ফেলছে। অন্যদিকে ডিমের দাম কিছুটা কমলেও মুরগি, মাছ ও গরুর মাংসের দাম রয়েছে চড়া।
নিত্যপণ্যের এমন লাগামহীন দামে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, বাজারে যথাযথ নজরদারি না থাকায় সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর, কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর ও নিউমার্কেট এলাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
দুই সপ্তাহে আদার দাম বেড়েছে কেজিতে ৬০ টাকা
বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে আদা, রসুন ও লেবুর দাম বৃদ্ধি। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে চীনা আদার দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। আগে যে আদা ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকায়।
একই সময়ে চীনা রসুনের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে ১৮০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। দেশি রসুনের দামও কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে দেশি রসুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে।
লেবুর বাজারেও দেখা গেছে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা। জাতভেদে প্রতি হালি লেবুর দাম ১৫ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ৩০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রান্নার নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব উপকরণের দাম একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি খরচ সামলাতে হচ্ছে ক্রেতাদের। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর দৈনন্দিন বাজারের খরচে এর প্রভাব পড়ছে।
শীতের আগাম সবজি বাজারে, তবু কমছে না ভোগান্তি
ছবি ঃ জেটিভি নিউজ বাংলা
শীতের আগাম সবজি বাজারে উঠতে শুরু করেছে। তবে সরবরাহ এখনো পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনেক সবজিই বিক্রি হচ্ছে তুলনামূলক বেশি দামে। যদিও গত সপ্তাহের তুলনায় কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত কমেছে, তবু সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিতে পুরোপুরি স্বস্তি ফিরেনি।
বর্তমানে পটোল, ঢ্যাঁড়শ ও ধুন্দল প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঝিঙার দাম কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকা। কচুমুখি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে।
এ ছাড়া কাঁকরোল ও বেগুনের দাম প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯০ টাকা। করলা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে। অন্যদিকে পেঁপে ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং মিষ্টিকুমড়া ৪০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।
শীতের আগাম সবজি শিমের দাম কিছুটা কমলেও এখনো তা অনেক ক্রেতার নাগালের বাইরে। বর্তমানে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায়। গত সপ্তাহে শিমের দাম কেজিপ্রতি ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
আকারভেদে ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। তবে টমেটোর দাম এখনো বেশ চড়া। প্রতি কেজি টমেটো কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ১৭০ থেকে ২০০ টাকা।
শান্তিনগর বাজারের সবজি বিক্রেতা বেলায়েত বলেন, বাজারে শীতের সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় দাম কিছুটা কমতির দিকে। তাঁর আশা, এখন নতুন করে আর সবজির দাম বাড়বে না।
পোলাও চালের দাম ২৩০ টাকা, আটা-ময়দাতেও ঊর্ধ্বগতি
চাল ও আটা-ময়দার বাজারেও স্বস্তি নেই। বিশেষ করে পোলাও চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে বিস্ময় দেখা দিয়েছে। আগে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া পোলাও চালের দাম এক লাফে বেড়ে মানভেদে ১৯০ থেকে ২৩০ টাকায় পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, বাজারে খোলা আটা প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা এবং প্যাকেটজাত আটা ৬৫ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সাধারণ চালের বাজারে মানভেদে নাজিরশাইল ও মিনিকেট চালের দাম প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯০ টাকা। পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে। আর মোটা চালের দাম প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, গত এক মাসে খোলা আটার দাম ২ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত আটার দাম ৮ শতাংশ বেড়েছে।
একই সময়ে খোলা ময়দার দাম ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত ময়দার দাম ৬ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে খোলা ময়দা প্রতি কেজি ৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
শুধু চাল, আটা ও ময়দা নয়, ডাল ও মসলার মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যও এখনো বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে দৈনন্দিন রান্নার খরচ মেটাতে গিয়ে বাড়তি চাপের মুখে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
ডিমের দাম কমেছে, তবে মুরগি ও মাংসে স্বস্তি নেই
নিত্যপণ্যের বাজারে ডিমের দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও মুরগি ও অন্যান্য মাংসের দাম এখনো চড়া।
সপ্তাহ দুয়েক আগে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম প্রতি ডজনে ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে ডজনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা কমে বর্তমানে ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায়।
তবে মুরগির বাজারে তেমন কোনো স্বস্তি নেই। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জাতভেদে সোনালি মুরগির দাম প্রতি কেজি ৩১০ থেকে ৩৫০ টাকা।
গরুর মাংসের দামও সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় চাপ হয়ে রয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়।
ফলে ডিমের দাম কিছুটা কমলেও পরিবারের আমিষের চাহিদা মেটাতে ক্রেতাদের এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
মাছের বাজারেও বাড়তি দাম
মাছের বাজারেও ক্রেতাদের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। তুলনামূলক কম দামের মাছ হিসেবে পরিচিত পাঙ্গাশের দামও এখন কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা।
মাঝারি ও বড় আকারের তেলাপিয়া মাছ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৪০ থেকে ২৮০ টাকায়।
এ ছাড়া চাষের রুই মাছের দাম প্রতি কেজি ৩৮০ থেকে ৫০০ টাকা। কাতল মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি দরে।
মাছের পাশাপাশি মুরগি ও গরুর মাংসের দামও বেশি থাকায় পরিবারের খাবারের তালিকায় প্রয়োজনীয় প্রোটিনের জোগান দিতে ক্রেতাদের বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে।
বাজার তদারকি নিয়ে ক্রেতাদের ক্ষোভ
নিত্যপণ্যের বাজারে একের পর এক মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ ক্রেতাদের ক্ষোভ বাড়ছে। পোলাও চাল, আটা-ময়দা, আদা, রসুন ও লেবুর দাম বৃদ্ধি যেমন তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে, তেমনি মাছ-মাংসের উচ্চমূল্যও সংসারের ব্যয় সামলানো কঠিন করে তুলছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাবে অসাধু ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছামতো নিত্যপণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। বাজারে পণ্যের সরবরাহ, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণ নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
বাজারে কিছু সবজির দাম কমতে শুরু করলেও চাল, আটা-ময়দা, আদা-রসুন, লেবু, মাছ ও মাংসের উচ্চমূল্যের কারণে সামগ্রিকভাবে স্বস্তি ফিরছে না। এ অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর নজরদারি, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে……..
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম