তাহসিফ সৌরির রহস্যজনক মৃত্যু: ছয় ঘণ্টা একসঙ্গে ছিলেন বন্ধু দীপ, জিজ্ঞাসাবাদে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক
পিবিআইয়ের হেফাজতে শাহরিয়ার দীপ, রাতভর অভিযান ও জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য | নিখোঁজের আগে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তদন্তকারীদের অনুসন্ধান অব্যাহত
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সৌরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে তদন্তের গতি বাড়িয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটানো তার জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার দীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সংস্থাটি। জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার দিনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন পিবিআই প্রধান।
তবে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া, তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার এবং ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো তৈরি হয়নি পরিষ্কার কোনো চিত্র। দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নৌ পুলিশের পাশাপাশি ছায়াতদন্ত শুরু করেছে পুলিশের বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা পিবিআই। তবে শাহরিয়ার দীপকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি সংস্থাটি।
মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে পিবিআই কার্যালয়ে নেওয়া হয় দীপকে
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের নিজ বাসভবন থেকে শাহরিয়ার দীপকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তাকে পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে দীপের সঙ্গে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছিলেন। ফলে ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ, তাদের যাতায়াত, কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে দেখা হয়েছিল এবং কী পরিস্থিতিতে তারা আলাদা হয়েছিলেন—এসব বিষয় জানতেই দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
শুধু কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তদন্ত কর্মকর্তারা। দীপকে সঙ্গে নিয়ে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযানও চালানো হয়েছে।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ ঘটনার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমরা সেখানে (ঘটনাস্থল) কথা বলছিলাম। এ সময় কিছু লোক ধাওয়া করে। তাহসিফ ভাই নদীতে ঝাঁপ দেন। আর আমি পালিয়ে আসি।’
তবে দীপের দেওয়া এই বক্তব্যের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তার বক্তব্যসহ জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া অন্যান্য তথ্য সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা।
পিবিআই প্রধানের বক্তব্যে মিলল গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ইঙ্গিত
শাহরিয়ার দীপকে হেফাজতে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামাল।
তিনি জানান, দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে তদন্তের স্বার্থে এসব তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
পিবিআই কর্মকর্তারা দীপের দেওয়া বক্তব্যের পাশাপাশি তার চলাচল, অবস্থান এবং ঘটনার দিনের বিভিন্ন তথ্য মিলিয়ে দেখছেন। বিশেষ করে তাহসিফের সঙ্গে শেষবার কোথায় এবং কী পরিস্থিতিতে তার দেখা হয়েছিল, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
ঘটনার আগে ছয় ঘণ্টা একসঙ্গে ছিলেন তাহসিফ ও দীপ
তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফ ও শাহরিয়ার দীপের একসঙ্গে কাটানো সময়।
এর আগে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের কাছে দীপ দাবি করেছিলেন, তাহসিফ ও তিনি একসঙ্গে গ্যারেজে গিয়েছিলেন। সেখানে মোটরসাইকেলসংক্রান্ত কাজ শেষে তারা রাতে খাওয়া-দাওয়া করেন।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পর রাজধানীর উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় তারা আলাদা হয়ে যান বলে দাবি করেন দীপ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখান থেকে তিনি নিজের বাসায় ফিরে যান। পরে তাহসিফকে ফোন করলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পান।
তবে দীপের আগের বক্তব্য এবং পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া নতুন বক্তব্যের মধ্যে ঘটনার বিবরণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।
বিশেষ করে দীপ যখন দাবি করছেন, কিছু লোকের ধাওয়ার মুখে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, তখন প্রশ্ন উঠছে—ঘটনাস্থলটি কোথায় ছিল, কারা তাদের ধাওয়া করেছিল এবং কী কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল?
এ ছাড়া উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় আলাদা হয়ে যাওয়ার আগের বক্তব্যের সঙ্গে নদীর পাড়ে ধাওয়ার ঘটনার সময় ও স্থান কীভাবে মিলে যায়, তা-ও যাচাই করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
দীপ কেন সাংবাদিকদের কাছে আগের বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং জিজ্ঞাসাবাদে নতুন করে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আনলেন, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে পিবিআই।
দীপের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, খতিয়ে দেখছে তদন্ত সংস্থা
তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় শাহরিয়ার দীপের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
তবে এখন পর্যন্ত দীপের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
পিবিআই জানিয়েছে, দীপের দেওয়া বক্তব্য ও তথ্যগুলো সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগতভাবেও এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তদন্তের প্রয়োজনে ঘটনার দিনের বিভিন্ন স্থান, সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, যাতে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার আগে ও পরে কী ঘটেছিল, তা বেরিয়ে আসে।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
গত ২৮ অক্টোবর বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নদী পুলিশ।
মরদেহের কাছে থাকা আইফোন ও হাতঘড়ি দেখে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে রহস্য তৈরি হয়। বিশেষ করে তিনি কীভাবে তুরাগ নদে গেলেন, কী পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হলো এবং মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় পরিবার।
এ ঘটনায় তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের সন্দেহ, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।
মাকে শেষ বার্তা: ‘আম্মু আমি আসছি’
তাহসিফ
তাহসিফের বাবা জানান, গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সারাদিন পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করেছিলেন তার ছেলে।
এরপর সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরিবারের কাছে তার বের হওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হলেও পরবর্তী সময়ে আর বাসায় ফিরে না আসায় উদ্বেগ তৈরি হয়।
বাবার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তার মায়ের মোবাইল ফোনে একটি টেক্সট মেসেজ পাঠান।
সেখানে লেখা ছিল, ‘আম্মু আমি আসছি।’
এটাই ছিল পরিবারের কাছে তাহসিফের শেষ বার্তাগুলোর একটি। ওই মেসেজ পাঠানোর পর থেকেই তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
পরদিন ভোর সোয়া ৫টার দিকে পুলিশের মাধ্যমে ছেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর জানতে পারে পরিবার।
তাহসিফের বাবা আরও জানান, তার ছেলে এর আগে কখনো তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় যাননি। ফলে কীভাবে তিনি ওই এলাকায় পৌঁছালেন, তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাবার সন্দেহ, ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম শুরু থেকেই ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন।
তার ধারণা, ছেলের মৃত্যুর পেছনে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা থাকতে পারে। তবে কীভাবে এবং কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো তথ্য দেননি।
তিনি জানিয়েছেন, তাহসিফের আগে কখনো রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় যাওয়ার তথ্য তাদের জানা ছিল না।
এ কারণে ছেলের মরদেহ উদ্ধারের স্থান, সেখানে যাওয়ার কারণ এবং মৃত্যুর আগের সময়ের ঘটনাগুলো সঠিকভাবে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বাবর রোডের বাসায় পাওয়া যায়নি দীপের পরিবারের কাউকে
এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে শাহরিয়ার দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর তার মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসভবনে গিয়ে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি।
বাসার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান, দীপ একজন শিক্ষার্থী।
তাহসিফের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলেও জানান তারা।
তবে নিরাপত্তাকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাত আড়াইটার দিকে বাসায় ফেরেন শাহরিয়ার দীপ।
অন্যদিকে তাহসিফের বাবা জানিয়েছেন, তার ছেলে ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। এরপর তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং পরদিন ভোরে পরিবার মরদেহ উদ্ধারের খবর পায়।
তদন্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেসব প্রশ্ন
তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে।
প্রথমত, নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফ ও দীপ দীর্ঘ সময় একসঙ্গে ছিলেন। দ্বিতীয়ত, দীপের আগের বক্তব্যে উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় আলাদা হওয়ার কথা বলা হলেও জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নদীর পাড়ে ধাওয়ার মুখে তাহসিফের ঝাঁপ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তৃতীয়ত, তাহসিফের মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে মাকে পাঠানো শেষ বার্তার সময় এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে কী ঘটেছিল, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
চতুর্থত, তাহসিফের আগে কখনো রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় না যাওয়ার বিষয়ে পরিবারের বক্তব্যও তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে দীপের বক্তব্য, ঘটনার দিনের সময়সূচি, যাতায়াত এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করছে পিবিআই।
তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে প্রকৃত ঘটনা কী, এটি দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড, কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না—তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
শাহরিয়ার দীপের দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা যাচাই এবং তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে পিবিআই ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্যের সঙ্গে, মানুষের পাশে……
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম