ময়মনসিংহে ডেঙ্গুর ভয়াবহ পরিস্থিতি: ২৪ দিনে ১৩ মৃত্যু, হাসপাতালে রোগীর চাপ তিন গুণ
ময়মনসিংহ | বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং
ময়মনসিংহে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (মমেক) ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ২৪ দিনে হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর চলতি বছর এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খেলন সরকার (৬৫) নামে আরও এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি ময়মনসিংহ নগরীর রামবাবু রোড এলাকার নরেন্দ্র সরকারের স্ত্রী। গত ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তিনি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার রাতে তার মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন মোট ১ হাজার ২৫১ জন। এর মধ্যে ৮১৫ জন পুরুষ, ৩৭৫ জন নারী এবং ৬১ শিশু। এ সময় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ৫৯, ছাড়পত্র ৭৬ জনের
ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ার মধ্যেই গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে ৫৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ৭৬ জন রোগীকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।
বর্তমানে হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছেন ১৩০ জন। তাদের মধ্যে ৯২ জন পুরুষ, ৩৮ জন নারী এবং ১০ শিশু রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মোট ২ হাজার ৭০৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এ সময় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মোট ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সেপ্টেম্বরেই ১৩ জনের মৃত্যু
হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। মাত্র ২৪ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ চলতি বছরে হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুতে যত মৃত্যু হয়েছে, তার একটি বড় অংশই ঘটেছে সেপ্টেম্বর মাসে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া খেলন সরকারও ছিলেন এই মৃত্যুর তালিকার সর্বশেষ সংযোজন। ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার রাতে তার মৃত্যু হয়।
ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ৫০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড
রোগীর চাপ সামাল দিতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য ৫০ শয্যার পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের বিশেষ নজরদারিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মাইনউদ্দিন খান বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ৫০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। সেখানে রোগীদের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। ভর্তি রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
হঠাৎ কেন বাড়ছে ডেঙ্গু?
ময়মনসিংহ জেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দীর্ঘায়িত বর্ষাকাল, দফায় দফায় বৃষ্টিপাত এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সাধারণ মানুষের অসচেতনতা।
সম্প্রতি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ফলে হাসপাতালের স্বাভাবিক সক্ষমতার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এ বছর বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত হয়েছে। পাশাপাশি দফায় দফায় বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। আর বৃষ্টির পর জমে থাকা পরিষ্কার পানিই এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। বৃষ্টির পর অল্প পরিমাণ পানি জমে থাকা বিভিন্ন পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, বেজমেন্ট ও অন্যান্য স্থানে মশার প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণেও বাড়ছে ঝুঁকি
ময়মনসিংহ শহর ও এর আশপাশের এলাকায় দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। প্রতিনিয়ত নির্মাণাধীন হচ্ছে নতুন ভবন ও স্থাপনা। এসব নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্ট, ছাদ, বিভিন্ন পাত্র এবং আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করায় সেখানে এডিস মশার লার্ভা তৈরি হচ্ছে।
বহুতল ভবনের ছাদ কিংবা বেজমেন্টে জমে থাকা পানি দীর্ঘদিন অপসারণ না করলে সেখানে এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে পানি জমে থাকলেও অনেক সময় তা নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না।
ফলে নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশার প্রজননস্থলও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাসাবাড়িতে অসচেতনতা, বাড়ছে মশার প্রজননস্থল
ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনে সাধারণ মানুষের অসচেতনতাকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাসাবাড়ির আঙিনা, ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্রসহ বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা যায়। এসব জমে থাকা পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে।
নিয়মিতভাবে এসব পাত্র ও জমে থাকা পানি পরিষ্কার না করলে মশার প্রজননস্থল তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব।
পরিত্যক্ত প্লাস্টিক, পাত্র, টায়ার ও বিভিন্ন আবর্জনা যত্রতত্র পড়ে থাকলে বৃষ্টির পানি জমে সহজেই মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে।
ঢাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাতায়াতেও সংক্রমণের ঝুঁকি

ময়মনসিংহের একটি বড় অংশের মানুষের নিয়মিত ঢাকা ও অন্যান্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাতায়াত রয়েছে। ফলে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে নিয়ে আসার ঝুঁকি থাকে।
এর ফলে ডেঙ্গু ভাইরাস স্থানীয়ভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশ তৈরি হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য ব্যক্তিকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মশা নিধন কার্যক্রমে ঘাটতির অভিযোগ
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধন কার্যক্রম চললেও স্থানীয় পর্যায়ে ড্রেন, ডোবা-নালা পরিষ্কার করা এবং কার্যকরভাবে লার্ভিসাইড ও মশক নিধন স্প্রে করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ফলে শুধু উড়ন্ত মশা নিধনের পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা না গেলে এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, জমে থাকা পানি অপসারণ, লার্ভা ধ্বংস এবং নাগরিকদের সচেতনতা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে।
উদ্বিগ্ন নগরবাসী
ময়মনসিংহ নগরীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। বিশেষ করে হাসপাতালে রোগীর চাপ এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় অনেকের মধ্যেই আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট এইচএম খালেকুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গুর বিষয়ে মানুষ এখনও তেমন একটা সচেতন নয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটালে হবে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো করতে না পারলে এডিস মশা কোনোভাবেই কমবে না। মশার উৎপাদন বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রোকনুজ্জামান সরকার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, বিশেষ করে ফগার মেশিন ব্যবহারের পাশাপাশি ইংল্যান্ডের তৈরি ট্যাবলেট ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া হোয়াইল বোম ড্রেনে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দাবি, এসব উদ্যোগের কারণে নগরীতে অনেকাংশে মশা কমে গেছে। তবে নাগরিকদের সহযোগিতা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন।
তিনি নাগরিকদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে সার্বিক সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার তাগিদ
ময়মনসিংহে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি নগরবাসীর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ড্রেন-নালা ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখা, বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ, নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনেই ১৩ জনের মৃত্যু এবং চলতি বছরে মোট ২৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একই সঙ্গে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭০৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা নেওয়ার তথ্যও ময়মনসিংহে ডেঙ্গুর বিস্তারের চিত্র তুলে ধরছে।
এ অবস্থায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ এবং নগরবাসীর সমন্বিত উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য,সাহস,সংযোগ…….
পাঠকদের মতামত ০টি
মডারেটেড ফোরাম